হার্ট অ্যাটাক বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা আজকালকার সময়ে বেশ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় খুব অল্প বয়সীদের মধ্যেও এই ধরনের সমস্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলার ইঙ্গিত দেয়। হঠাৎ করেই কোনো সুস্থ মানুষ তীব্র শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন—এমন খবর আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত শোনা যায়। চিকিৎসকরা বলছেন, শরীরের ভেতরে হার্ট অ্যাটাকের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে হৃৎপিণ্ড কিছু সংকেত পাঠায়। এই সংকেতগুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারা এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি বা প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব।
হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে এক ধরনের অস্বাভাবিক অস্বস্তি বা চাপ অনুভব করা। এই ব্যথাটি স্থির থাকে না; অনেক সময় এটি কয়েক মিনিট ধরে স্থায়ী হয়, আবার কিছুক্ষণ পর কমে গিয়ে পুনরায় ফিরে আসতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি বুকে এমন এক চাপের অনুভূতি পান, যা অনেকটা ভারী কোনো বস্তু বুকের ওপর চেপে থাকার মতো মনে হতে পারে। কেবল বুক নয়, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হিসেবে পিঠ, ঘাড়, চোয়াল এমনকি পাকস্থলীতেও অস্বস্তিকর অনুভূতি হতে পারে। এর সঙ্গে অনেকের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় বা শ্বাস ছোট হয়ে আসে। শরীর ঠান্ডা হয়ে ঘাম বের হওয়া এবং বমি বমি ভাব হওয়াও হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম উপসর্গ। এসব লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া বা হাসপাতালে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
আমাদের হৃৎপিণ্ড যখন শরীরে রক্ত সঞ্চালন করতে গিয়ে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ করতে পারে না বা এই সঞ্চালন প্রক্রিয়াটি অনিয়মিত হয়ে পড়ে, তখনই মূলত হার্ট অ্যাটাক ঘটে। উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। তাই ত্রিশোর্ধ্ব বয়সীদের গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা এবং হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণের মধ্যে পার্থক্য বুঝে চলা জরুরি। অনেক সময় আমরা বুকে ব্যথার সাধারণ কারণকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে ভুল করি, যা ভবিষ্যতে বিপদ ডেকে আনতে পারে।
যদি হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে ভয় পাওয়া যাবে না। ভয় বা আতঙ্ক পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। এমন জরুরি মুহূর্তে রোগীকে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার জন্য কিছু বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। রোগীকে দ্রুত জোরে এবং ঘন ঘন কাশি দিতে উৎসাহিত করতে হবে। প্রতিবার কাশি দেওয়ার আগে একটি দীর্ঘশ্বাস নেওয়া প্রয়োজন। এভাবে প্রতি দুই মিনিট পরপর কাশি ও দীর্ঘশ্বাসের প্রক্রিয়াটি চালিয়ে যেতে হবে। এই প্রক্রিয়ার মূল কারণ হলো, দীর্ঘশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং কাশির মাধ্যমে বুকের ভেতরে চাপের সৃষ্টি করা। এই চাপের ফলে হৃৎপিণ্ড সাময়িকভাবে রক্ত সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্দীপনা পায়, যা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত রোগীকে কিছুটা সাপোর্ট দিতে সক্ষম হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি কেবলই একটি প্রাথমিক সহায়তামূলক পদক্ষেপ। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে স্থানান্তর করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তিতে এখন হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় এনে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হচ্ছে। তাই কোনোভাবেই লক্ষণগুলোকে অবহেলা না করে সচেতন থাকা এবং সুস্থ জীবনযাপনের চর্চা করাই হলো হৃদরোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাবার গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তোলা আমাদের হৃৎপিণ্ডকে দীর্ঘমেয়াদে ভালো রাখতে সাহায্য করবে। সচেতনতাই হতে পারে এই ধরনের আকস্মিক বিপদের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:১৪ অপরাহ্ণ