বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘশ্বাস আর আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর ঘোরার চিত্র এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রংপুর অঞ্চলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার জট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে। ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরতে গিয়ে সহায়-সম্বল হারানোর আর্তনাদ এখন আদালতপাড়ার বাতাসে মিশে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে, মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবারের গরু-ছাগল কিংবা হাঁস-মুরগি পর্যন্ত বিক্রি করে নিঃস্ব হতে হয়েছে ভুক্তভোগীদের। কিন্তু সবটুকু হারিয়েও কাঙ্ক্ষিত বিচারের দেখা মেলেনি।
রংপুর জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তিনটি আদালতে বর্তমানে মামলার সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা এই বিপুল সংখ্যক মামলা বিচার ব্যবস্থার ওপর এক বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। বিচারপ্রার্থীরা পাঁচ থেকে ১৮ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন, কিন্তু মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এই দীর্ঘসূত্রতা শুধুমাত্র সময়ের অপচয় নয়, বরং এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঝুলে থাকা এই ছয় হাজার মামলার মধ্যে দুই হাজারেরও বেশি মামলা সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগ সংক্রান্ত। এছাড়া যৌতুক ও নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগে দায়ের করা প্রায় ৩০০টিরও বেশি মামলা ১৫ থেকে ১৮ বছর ধরে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই মামলাগুলোর চূড়ান্ত রায় না আসাটা ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
একজন ভুক্তভোগী যখন আইনের আশ্রয় নেন, তখন তিনি দ্রুত বিচার পাওয়ার প্রত্যাশাই করেন। কিন্তু যখন দেখেন মামলার তারিখের পর তারিখ পড়ছে, কিন্তু সাক্ষ্য গ্রহণ বা বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই, তখন তাদের হতাশা চরমে পৌঁছায়। মামলার খরচ, উকিলের ফি এবং আদালতে যাতায়াতের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা সাধারণ নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য অসহনীয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি মামলার পেছনে ছোটাছুটি করতে গিয়ে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন, ফলে পুরো পরিবারটি অর্থনৈতিক ধসের মুখে পড়ছে।
মামলার এই দীর্ঘ জটের পেছনে বহুমুখী কারণ রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও আইনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি, তবুও সময়ক্ষেপণের কারণগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সাক্ষীদের অনুপস্থিতি, আইনজীবীদের বারবার সময় প্রার্থনাসহ নানা আইনি মারপ্যাঁচে মামলাগুলো বছরের পর বছর আটকে থাকছে। এছাড়া মামলার অনুপাতে বিচারক বা আদালতের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়াটাও একটি বড় কারণ। এমন পরিস্থিতিতে বিচারপ্রার্থীরা বুঝতে পারেন না তাদের দুর্দশার শেষ কোথায়।
দেশের বিচার ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু যখন একটি মামলা বিচার পেতে দেড় যুগ সময় অতিবাহিত করে, তখন সেই বিচারের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অপরাধীরা এই দীর্ঘ সময়ের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন বা সমঝোতার চেষ্টা করে, যার ফলে মামলার মেরিট অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে এবং সমাজে এক ধরনের বিচারহীনতার আবহ তৈরি করছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই সমস্যা নিরসনে আইনি প্রক্রিয়া গতিশীল করা জরুরি। বর্তমানে মামলার যে বিশাল বোঝা জমেছে, তা দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদ্যমান আইনি জটিলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা আবশ্যক। বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘশ্বাস আর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে হলে আদালতের কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা আনার পাশাপাশি প্রতিটি মামলার মেরিট অনুযায়ী দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। তাই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি পোক্ত করতে হবে। আদালতের বারান্দায় আর কোনো বিচারপ্রার্থী যেন সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব না হন এবং মামলার তারিখের চক্রে পড়ে আর যেন কোনো জীবন ধ্বংস না হয়, সেটিই এখন সময়ের দাবি। বিচার বিভাগীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এই জট নিরসনে আন্তরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তবেই সাধারণ মানুষ আইনের শাসন সম্পর্কে পুনরায় আশাবাদী হতে পারবে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ