মস্কোতে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আফ্রিকান সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রধান সম্পাদকদের সঙ্গে আলাপচারিতার সময় ল্যাভরভ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সাম্প্রতিক ডিজেল জ্বালানি সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই চুক্তি কেবল অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থেই করা হয়েছে। এতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা নিরাপত্তার কোনো বিষয় জড়িত নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই চুক্তি নিয়ে যে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে, তাকে একপ্রকার নিরসন করতেই তিনি এমন বক্তব্য প্রদান করেন।
সের্গেই ল্যাভরভ বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যেকোনো লেনদেনই মূলত অর্থনৈতিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই জ্বালানি চুক্তিও তার ব্যতিক্রম নয়। ল্যাভরভের মতে, বর্তমান সময়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ জটিল হলেও ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই জটিলতা টেনে আনা যুক্তিযুক্ত নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো দেশের সঙ্গেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সময় রাশিয়া রাজনৈতিক শর্তারোপ করে না এবং একইভাবে অন্য দেশগুলো যখন রাশিয়ার সঙ্গে কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি করে, তখন সেটিকেও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করা উচিত নয়। তার এই বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল বিষয়টি পরিষ্কার করা যে, এই চুক্তির পেছনে কোনো গোপন বা কৌশলগত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লুকানো নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক অত্যন্ত টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি বা ডিজেল সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের চুক্তি স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহলের জন্ম দেয়। বিশেষ করে যখন জ্বালানি পণ্যকে প্রায়শই একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তখন ল্যাভরভের এই বিবৃতিটিকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে রাশিয়া বিশ্বের কাছে এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে, তারা কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবেও নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে আগ্রহী।
ল্যাভরভ তার বক্তব্যে এটিও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এ ধরনের বাণিজ্যিক সমঝোতা রাশিয়ার নিজস্ব অর্থনীতির জন্যও জরুরি। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের চেইন বজায় রাখার জন্য রাশিয়া সব সময়ই তার নিজস্ব ব্যবসায়িক কৌশল অবলম্বন করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ডিজেল চুক্তিটিও সেই কৌশলেরই অংশ। এতে কোনো পক্ষ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে না বরং উভয় পক্ষই নিজেদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।
মস্কোর এই বৈঠকে আফ্রিকান মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সামনে ল্যাভরভের এই স্বচ্ছ উপস্থাপন কেবল একটি নির্দিষ্ট চুক্তি নিয়ে ছিল না, বরং এটি ছিল রাশিয়ার বৈশ্বিক নীতি কৌশলের একটি প্রতিফলন। রাশিয়া বোঝাতে চেয়েছে যে, তাদের পররাষ্ট্রনীতি শুধু বৈরিতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় না, বরং যেখানে বাণিজ্যিক স্বার্থের মিল রয়েছে সেখানে তারা সহযোগিতার পথও খোলা রাখে। ল্যাভরভের এই অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাশিয়ার এই বাণিজ্যিক নিরপেক্ষতার বার্তা সামনের দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলবে কি না, তা দেখার বিষয়। তবে আপাতত, মস্কো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল যে, তারা জ্বালানি ব্যবসাকে রাজনীতির মাঠ থেকে দূরে রেখেই পরিচালনা করতে চায়।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ