কৃষিকাজের প্রতি মানুষের টান সহজাত। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই অভ্যাসের সঙ্গে যাদের জীবন জড়িয়ে থাকে, তাদের কাছে মাটি ও ফসলের সম্পর্ক কেবল উৎপাদনের নয়, বরং শেকড়ের। এমন এক গভীর অনুরাগের গল্প উঠে এসেছে এক প্রবাসীর লেখনীতে। সুদূর সুইডেনে বসতি গড়লেও নিজের শিকড়কে তিনি ভুলে যাননি, বরং সেখানে বসেই বাংলাদেশের দেশি শাকসবজি চাষের এক অনন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিজের পারিবারিক ঐতিহ্যের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে তার বাবা সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। ব্রিটিশ শাসনামলে নীলচাষকে কেন্দ্র করে এলাকায় যে ভয়াবহ অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বাঁচতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ছাড়া তৎকালীন সময়ে খুব একটা বিকল্প পথ ছিল না। সেই পরিস্থিতির কারণেই তার দাদা বাবাকে পুলিশ প্রশাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। শারীরিক গঠন ও যোগ্যতার কারণে তিনি পুলিশে যোগ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, কিন্তু সরকারি চাকরি করলেও কৃষি বা মাটির টান তিনি কখনোই ত্যাগ করেননি। দীর্ঘ ৩০ বছরের কর্মজীবন কিংবা অবসরের পরবর্তী সময়ে—সব সময়ই তিনি চাষাবাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।
সেই ধারা বজায় রেখে বর্তমান প্রজন্ম প্রবাসে থেকেও কৃষিচর্চা চালিয়ে যাচ্ছে। সুইডেনের মতো শীতপ্রধান দেশেও গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী শাকসবজি চাষ করে তিনি দেখিয়েছেন, সঠিক পদ্ধতি ও পরিশ্রম থাকলে যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশেও কৃষি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এই কৃষিকাজ যেন তার কাছে দেশ ও মাটির কাছাকাছি থাকার এক বিশেষ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত এই সাফল্যের পাশাপাশি তিনি একটি উদ্বেগের কথাও জানিয়েছেন। পৈতৃক ভিটা বা জমিজমা এখন আর তাদের সরাসরি দেখভালের মধ্যে নেই। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সেই জমির ভোগদখল নিয়ে বর্তমানে বেশ কিছু অনিয়মের অভিযোগ তার নজরে আসছে। দীর্ঘকাল গুরুত্বের অভাবে বিষয়টি এক প্রকার অবহেলিতই ছিল। কিন্তু এখন তিনি অনুভব করছেন, পূর্বপুরুষের এই সম্পদ কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো বিষয় নয়, বরং এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মর্যাদা রক্ষা করা বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব। তাই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যা সমাধানে এখন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে বলে তিনি মনে করেন।
প্রবাসে কৃষিকাজের এই অভিজ্ঞতা তাকে যেমন নতুন করে অনুপ্রাণিত করছে, তেমনি নিজের মাটির অধিকার ও তদারকির বিষয়টি নিয়ে তাকে ভাবিয়ে তুলছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে নিজের ঐতিহ্যের প্রতি এই দায়বদ্ধতা ও কৃষির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা যেন এক নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। মাটির গন্ধ আর নিজের হাতের ফসলের মাঝে তিনি খুঁজে পাচ্ছেন সেই আদি শেকড়কে, যা হাজার মাইল দূরে থেকেও তাকে বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে বেঁধে রেখেছে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:১৪ পূর্বাহ্ণ