আব্বাসউদ্দীন আহমদের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনে সংগীতের আসর

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:১৪ পূর্বাহ্ণ

বাংলার লোকসংগীতের অবিস্মরণীয় নাম আব্বাসউদ্দীন আহমদ। প্রান্তিক অঞ্চলের সুরকে নাগরিক সমাজের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে যে কয়জন শিল্পী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ভাওয়াইয়া গানের কিংবদন্তি হিসেবে দেশজুড়ে সমাদৃত হলেও, সংগীতের বিভিন্ন ধারায় ছিল তার অবাধ বিচরণ। তার ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সম্প্রতি ধানমন্ডির ছায়ানট মিলনায়তনে এক বিশেষ সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বরেণ্য এই শিল্পীকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন বর্তমান প্রজন্মের শিল্পী ও সংগীতাঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা।

১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। জীবনভর গানের সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করা এই শিল্পী শুধু লোকসংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। নজরুলসংগীত, আধুনিক গান এবং বিশেষ করে ইসলামি গানের ক্ষেত্রেও তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ইসলামি গান রচনার ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে গাওয়া ইসলামি গানগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

ছায়ানট আয়োজিত এই সংগীতানুষ্ঠানের শুরুতেই সূচনা বক্তব্য রাখেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী। তিনি বলেন, বাংলা সংগীতের জগতে আমাদের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার রয়েছে। ছায়ানট সেই লোকজ সাংগীতিক ঐতিহ্যকে জনসাধারণের কাছে তুলে ধরার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ জনপদে আমাদের গীতিকার ও সুরকারেরা যে অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধের সংগীত সৃষ্টি করেছেন, তা সমাজে সম্প্রীতি বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে। আর লোকসংগীতশিল্পীরা সেই সুরকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। এই মহান শিল্পীদের দীর্ঘ তালিকায় আব্বাসউদ্দীন আহমদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বিরাজমান।

স্মরণানুষ্ঠানের সংগীত পরিবেশনায় অংশ নেন খ্যাতিমান শিল্পী কিরণ চন্দ্র রায়সহ নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই পরিবেশন করা হয় কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি গান ‘এ কোন মধুর শারাব দিলে’। গানটি গেয়ে শোনান তরুণ শিল্পী প্রিয়ন্ত দেব। এরপর তিনি আরও একটি গান পরিবেশন করেন, যা ছিল কাজী নজরুল ইসলামের ‘বসিয়া নদীকূলে, এলোচুলে কে উদাসীনী’। আব্বাসউদ্দীন আহমদের গাওয়া কালজয়ী গানগুলো নতুন করে শুনে উপস্থিত শ্রোতারা যেন সেই সোনালি অতীতে ফিরে গিয়েছিলেন।

আব্বাসউদ্দীন আহমদের সংগীত জীবন কেবল সুরের মূর্ছনা ছিল না, বরং তা ছিল বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ দলিল। ভাওয়াইয়া গানের বৈশিষ্ট্য এবং তার গায়কী ঢং আজও লোকসংগীতের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্য। তার গাওয়া প্রতিটি গানে মাটির গন্ধ ও মানুষের আবেগ এমনভাবে মিশে থাকত যা তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ সংগীত জীবনে তিনি অসংখ্য গান রেকর্ড করেছেন এবং বেতার ও মঞ্চে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করেছেন।

এদিনের আয়োজনে আব্বাসউদ্দীন আহমদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তারা বলেন, বর্তমান প্রজন্মের কাছে তার কাজগুলো নতুন করে তুলে ধরা প্রয়োজন। সংগীতের বহুমুখী ধারায় পারদর্শী এই শিল্পী যেভাবে নিজের জীবন ও শিল্পকে সাজিয়েছিলেন, তা পরবর্তী শিল্পীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। ছায়ানটের এই উদ্যোগের মাধ্যমে কিংবদন্তি এই শিল্পীর প্রতি যে বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো হলো, তা নতুন প্রজন্মের তরুণদের সংগীতের শেকড় সন্ধানে উৎসাহিত করবে। অনুষ্ঠানজুড়ে সংগীতপ্রেমী ও অনুরাগীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়, যারা এই মহান শিল্পীর স্মৃতির প্রতি ভালোবাসা জানাতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন