বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা কথিত ক্রসফায়ার নিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পদে থেকে এই ধরনের বক্তব্য আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। এই প্রেক্ষিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং মানবাধিকার সংস্থা অধিকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে।
টিআইবি এবং অধিকারের পক্ষ থেকে পাঠানো আলাদা বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা যখন আইনের শাসনের পরিপন্থী কোনো বক্তব্য দেন, তখন সেটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। বিচারবহির্ভূত হত্যা কোনো সভ্য সমাজে পুলিশের আইনি কার্যক্রম হতে পারে না। আইনি কাঠামো অনুযায়ী, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তার বিচার হওয়ার কথা আদালতে। পুলিশের দায়িত্ব হলো অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা, তাকে বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা। কিন্তু ক্রসফায়ারের সাফাই গাওয়া বা এর যৌক্তিকতা নিয়ে কথা বলা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিগত সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়মুক্তির সংস্কৃতি লক্ষ্য করা গেছে। এখন পুলিশ মহাপরিদর্শকের মতো দায়িত্বশীল পদে থাকা কেউ যখন এই বিষয়ে বিতর্কিত বক্তব্য প্রদান করেন, তখন তা অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কেবল মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনই নয়, এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও আইনি কাঠামোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
টিআইবি-এর পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, পুলিশ মহাপরিদর্শকের এমন বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকারান্তরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যেকের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যদি নিজেরাই আইনের প্রয়োগকর্তা না হয়ে বিচারকের ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
উভয় সংস্থার ভাষ্যমতে, পুলিশের কাজ হলো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও তদন্তের মাধ্যমে অপরাধের রহস্য উদঘাটন করা এবং আদালতে যথাযথ চার্জশিট দাখিল করা। এর পরিবর্তে ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত পথ অবলম্বন করা কোনো আইনি সমাধান নয়। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। টিআইবি ও অধিকার দ্রুত এই ধরনের বিতর্কিত বক্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একজন পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য আসার পর বিষয়টি নিয়ে যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত এবং এই বিষয়ে পুলিশের অবস্থানের স্পষ্টীকরণ দরকার। বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ক্রসফায়ার বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন টিআইবি ও অধিকারের দায়িত্বশীলরা। তাদের মতে, কোনোভাবেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করার সুযোগ নেই এবং রাষ্ট্রের সকল বাহিনীকে আইনের শাসনের সীমানার ভেতরে থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ৯:১৫ অপরাহ্ণ