জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে অস্থিরতা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল, তার রেশ এখনো আইন-আদালতের আঙিনায়। বিশেষ করে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এই মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ মোট চারজন আসামি রয়েছেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি এখন এমন একটি ধাপে পৌঁছেছে যেখানে বিচারক রায় ঘোষণার দিন তারিখ নির্ধারণের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে পারেন। আজ সংশ্লিষ্ট আদালতে এ বিষয়ে শুনানি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আইনি সূত্রে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ওই সময়ে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও নিরীহ মানুষের ওপর নৃশংস হামলার অভিযোগ ওঠে। সেই সহিংসতায় ছয়জন প্রাণ হারানোর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে আসামি করা হয়। মাহবুব-উল আলম হানিফসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ইতিমধ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র উপস্থাপন করেছেন। আদালত দীর্ঘ সময় ধরে উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করেছেন এবং মামলার নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছেন। এখন চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।
আইনজীবীদের মতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং স্পর্শকাতর। এই ধরনের মামলায় প্রতিটি সাক্ষ্য ও প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই-বাছাই করা হয়। কুষ্টিয়ার এই মামলায় চারজন আসামির সম্পৃক্ততার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যেসব তথ্য-উপাত্ত হাজির করেছে, তার ওপর ভিত্তি করেই আদালত তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। আজ যদি রায়ের জন্য কোনো দিনক্ষণ ধার্য করা হয়, তবে সেটি হবে বিচার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপ। এর আগে আসামিপক্ষ নিজেদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য ও যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন, যা আইনি বিধিমালার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মামলাটি পরিচালনা করছেন রাষ্ট্রপক্ষের অভিজ্ঞ আইনজীবীরা, যারা শুরু থেকেই প্রতিটি সেশনে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিজেদের মক্কেলদের নির্দোষ দাবি করার চেষ্টা করেছেন। বিচারক উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আজ রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে আদেশ দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এবং আদালতের কার্যতালিকার ওপর নির্ভর করছে।
সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। আন্দোলনের সময় যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীরা সাজা পাবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। একই সাথে দেশের চলমান বিচারিক সংস্কার ও কঠোর আইনি ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই এই মামলাটিকে দেখা হচ্ছে।
আইনি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আজ যদি রায় ঘোষণার দিন ঠিক করা হয়, তবে তা দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি বার্তা দেবে যে, জননিরাপত্তা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। মামলার পরবর্তী শুনানি ও আদালতের আদেশের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত বিচারিক রায় ঘোষণা করা হবে। আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা আজ দিনের কার্যক্রমের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:১৪ অপরাহ্ণ