শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় তাতীহাটি ইউনিয়নের শালমারা গ্রামে এক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে। ৬০ বছর বয়সী আব্দুল করিম, যিনি শালমারা গ্রামের মৃত শমসের আলীর পুত্র, রবিবার বিকেলে স্বাস্থ্যের অবনতি থেকে মৃত্যুবরণ করেন। তার পরিবার দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে জমি না থাকায় দাফনের জন্য কোনো পারিবারিক কবরস্থান ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
পরিবারের সদস্যদের মতে, মৃতদেহকে গৃহের ভিতরে দাফন করার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ জরুরি এবং বিকল্পের অভাবে নেওয়া হয়। তাই, ঘরের এক প্রাচীর ভেঙে একটি ছোট গর্ত তৈরি করা হয় এবং সেখানে দেহটি সমাধিস্থ করা হয়। স্থানীয় রীতিনীতি অনুসারে, দেহটি দাফনের পরই দেহের পাশে একটি ছোট কাঠের গুঁড়ি রাখা হয়, যাতে মৃতের আত্মার শান্তি নিশ্চিত হয়।
দাফনের কাজটি সোমবার সকাল প্রায় দশটায় সম্পন্ন হয়। স্থানীয় মসজিদে নামাজের পর, পরিবার এবং প্রতিবেশীরা একত্রিত হয়ে শেষ দাফন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। দাফনের পর ঘরের এক পাশে এখন একটি ছোট কবর গড়ে উঠেছে, যেখানে মৃতের নাম ও তারিখ খোদাই করা হয়েছে। অন্য পাশে, তার স্ত্রী এখনও একই ঘরে বসবাস করছেন, যা আশেপাশের মানুষের মধ্যে বিস্ময় ও প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
শালমারা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আব্দুল করিমের স্ত্রী একা গৃহে বসে থাকবেন এবং ঘরের দুই পাশে থাকা এই অদ্ভুত বিন্যাসের ফলে তার দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা অস্বস্তি হতে পারে। তবুও, তিনি এই পরিস্থিতি স্বীকার করে গৃহের দুই দিকের মধ্যে কোনো বাধা না রেখে জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে, স্বামীর শেষকৃত্য গৃহের ভিতরে দাফন করা ছিল একমাত্র উপায়, কারণ পারিবারিক জমি না থাকায় অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।
স্থানীয় প্রশাসন এই ঘটনার ব্যাপারে জানিয়ে দেয় যে, গৃহের ভিতরে দাফন করা আইনগতভাবে অনুমোদিত নয় এবং এটি ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না হওয়ার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে, বর্তমানে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, কারণ পরিবার ইতিমধ্যে দাফন কাজ সম্পন্ন করেছে এবং তা প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়।
এই ঘটনাটি সামাজিক মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আলোচনা সৃষ্টি করে। কিছু মন্তব্যকারী এই ধরনের গৃহের ভিতরে দাফনকে মানবিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনা করেন, আবার অন্যরা পরিবারিক দুর্ভাগ্য ও সম্পদের অভাবের কারণে এধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া স্বাভাবিক বলে যুক্তি দেন।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, গ্রামীণ এলাকায় জমি ও কবরস্থান সংক্রান্ত সমস্যাগুলি প্রায়শই সামাজিক সংঘাতের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার ও সমাজসেবী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব বাড়ে, যাতে পরিবারগুলোকে যথাযথ সমাধান প্রদান করা যায় এবং অনধিকারিক দাফনের মতো অনুচিত প্রথা রোধ করা যায়।
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার মেয়র এই বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, “আমরা গ্রামাঞ্চলে কবরস্থান ও জমি সংক্রান্ত সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করছি। এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হয় তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, ভবিষ্যতে এধরনের সমস্যার সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করবে।
আব্দুল করিমের পরিবার এখন এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সামলাতে চেষ্টা করছে। তার স্ত্রী গৃহের অন্য পাশে বসে, স্বামীর স্মৃতি রক্ষার পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবেশীরা তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে এবং প্রয়োজনে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই ঘটনা গ্রামীণ সমাজে জমি ও কবরস্থান সংক্রান্ত সমস্যার গভীরতা তুলে ধরেছে এবং ভবিষ্যতে এমন অনন্য পরিস্থিতি এড়াতে নীতি নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করেছে। স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা সংস্থা এবং জনগণ একসঙ্গে কাজ করে এই ধরনের সমস্যার সমাধান করা জরুরি, যাতে পরিবারগুলোকে মানবিক ও আইনগতভাবে সঠিক সমাধান প্রদান করা যায়।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ