ক্রসফায়ার নিয়ে মন্তব্য: আইজিপির অপসারণ ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন নূর খান লিটন

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:১৪ অপরাহ্ণ

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে কথা বলার মাধ্যমে পুলিশ প্রধান তাঁর পদে বহাল থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন।

আইজিপির এই বিতর্কিত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদের সুর শোনা যাচ্ছে। এর আগে ন্যাশনাল কমিটি ফর প্রটেকশন (এনসিপি)-এর পক্ষ থেকেও তাঁর অপসারণের জোরালো দাবি তোলা হয়েছে। তারা মনে করছেন, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থেকে এ ধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্য আইন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয় বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধান যখন নিজেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো একটি বেআইনি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক প্রক্রিয়ার পক্ষে সাফাই গান বা এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, তখন দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। এটি সংবিধান ও আইনের শাসনের সাথে সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্রের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে তার নিরপেক্ষ ও আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করার কথা ছিল, কিন্তু তিনি যেভাবে সরাসরি ক্রসফায়ারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাতে তিনি নিজের পদের মর্যাদা ও নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

মূলত, আইজিপির এই বক্তব্যের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো অপরাধের বিচার হবে প্রচলিত আইনের আওতায় এবং আদালতে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। আইজিপির এই মন্তব্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরের এই মন্তব্যটি বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় ধরনের আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। বিরোধী মতের পাশাপাশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, এ ধরনের বক্তব্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতাকে উৎসাহিত করতে পারে। একইসঙ্গে, এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার একটি অপপ্রয়াস হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, অবিলম্বে সরকারকে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে এবং আইজিপির মতো স্পর্শকাতর পদে আসীন থাকা একজন কর্মকর্তার এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যদিও সরকারি তরফে এই ইস্যুতে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে জনমনে এই বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। আইজিপি তাঁর এই বক্তব্য দিয়ে জননিরাপত্তার পরিবর্তে ভীতির পরিবেশ তৈরি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিনের। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো একটি গুরুতর বিষয়ের পক্ষে বক্তব্য আসাটা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন আইনজ্ঞরা। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং মানুষের আস্থা অর্জনে পুলিশ প্রধানের এমন বক্তব্যের ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিতর্কিত এই ঘটনার পর থেকে এখন সবার নজর সরকারের সিদ্ধান্তের দিকেই রয়েছে যে, পুলিশ প্রধানের এই মন্তব্যকে তারা কীভাবে মূল্যায়ন করবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন