জাপানের বুলেট ট্রেন মানেই বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর আরামদায়ক ভ্রমণের এক অনন্য নাম। দেশটির রেল ব্যবস্থা সময়ের নিখুঁত হিসাব, চরম পরিচ্ছন্নতা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য পর্যটকদের কাছে সব সময় আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে। ট্রেনের ভেতরে স্বয়ংক্রিয় দরজা, আরামদায়ক আসন বিন্যাস এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের মতো নানা সুযোগ-সুবিধা যাত্রীদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে করে তোলে আনন্দদায়ক। তবে এত আধুনিকতার ভিড়েও একজন ভারতীয় পর্যটকের মনে হয়েছে, সেখানে যেন বড় কোনো এক জিনিসের অভাব রয়েছে। আর সেই অভাবটিই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি হর্ষিতা গুপ্ত নামের একজন ভারতীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর জাপানের বুলেট ট্রেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তার সেই ভিডিও এবং অভিজ্ঞতা শেয়ার করার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। হর্ষিতার মতে, জাপানি ট্রেনের প্রযুক্তিগত দিক বা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, বরং তিনি যে অভাবটি অনুভব করেছেন তা আমাদের দেশীয় রেল ভ্রমণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক আবেগের জায়গা। তিনি জানিয়েছেন, জাপানি ট্রেনে চড়ার সময় তার বারবার ভারতীয় ট্রেনের সেই চিরচেনা হাঁকডাকের কথা মনে পড়ছিল, যা যাত্রাপথে ভিন্ন এক আবহ তৈরি করে।
ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে ট্রেনে দীর্ঘ ভ্রমণের সময় চা কিংবা কফির বিক্রেতাদের সেই পরিচিত ডাক প্রতিটি যাত্রীরই স্মৃতির অংশ। ট্রেনের কামরায় ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক এবং গরম চায়ের কাপের সেই আড্ডা না থাকলে যেন সফর অসম্পূর্ণ থেকে যায়। হর্ষিতা লক্ষ্য করেছেন, জাপানের অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং শান্ত পরিবেশে এই ধরনের প্রাণের স্পন্দন বা কোলাহল একেবারেই অনুপস্থিত। সেখানে সব কিছু চলে নির্দিষ্ট নিয়মে, যেখানে হকারের হাঁকডাক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো পরিবেশের সুযোগ নেই। জাপানের ট্রেনগুলো যেমন দ্রুতগামী এবং আরামদায়ক, ঠিক তেমনি তা অনেকটাই নিস্তব্ধ এবং নিয়ন্ত্রিত। এই অতিরিক্ত শৃঙ্খলাই যেন হর্ষিতার কাছে মনে হয়েছে এক ধরণের অভাব।
সামাজিক মাধ্যমে তিনি তার এই অনুভূতি প্রকাশের পর অনেকেই তার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। তবে এই আলোচনা জাপানের রেল ব্যবস্থা বনাম আমাদের দেশীয় রেলের সংস্কৃতির একটি তুলনামূলক চিত্র সামনে এনেছে। একদিকে জাপানের প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতা, অন্যদিকে ভারতের ট্রেনের সাথে জড়িয়ে থাকা আবেগ ও সামাজিক মেলবন্ধন—এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্যটিই এই ভিডিওর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাপানের ট্রেনে আধুনিক সব সুবিধা থাকলেও সেখানে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের সেই অনানুষ্ঠানিক যে উষ্ণতা, তা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তবে পর্যটন বিশেষজ্ঞ এবং নিয়মিত জাপান ভ্রমণকারীদের মতে, জাপানের ট্রেন ব্যবস্থায় এই ‘অভাব’ মূলত তাদের সংস্কৃতিরই অংশ। জাপানিরা গণপরিবহনে অন্যের বিরক্তির কারণ হতে পছন্দ করেন না, তাই ট্রেনের ভেতরে কোলাহল বা হাঁকডাক নিষিদ্ধ বা অসামাজিক হিসেবে বিবেচিত হয়। তাদের কাছে ট্রেনের সফর মানেই বিশ্রাম কিংবা নিজের মতো সময় কাটানো। তাই হর্ষিতা যে অভাবটির কথা উল্লেখ করেছেন, তা আসলে জাপানের রেল সংস্কৃতিরই একটি প্রতিফলন। এই প্রতিবেদনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উন্নয়ন ও আধুনিকতার সংজ্ঞা দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং প্রযুক্তির উৎকর্ষ যেখানে এক ধরণের স্বাচ্ছন্দ্য আনে, সেখানে হয়তো আমাদের ফেলে আসা ছোট ছোট আনন্দের স্মৃতিগুলো কোথাও না কোথাও হারানো সুর হয়ে বেজে ওঠে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:১৪ অপরাহ্ণ