জলবায়ু পরিবর্তনের রূঢ় বাস্তবতায় উপকূলের প্রবীণরা: নিঃসঙ্গতায় কাটছে শেষবেলা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:১৪ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন চরম আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি ধাক্কায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সেখানকার প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবন। আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের দিকে তাকালে উপকূলের এই করুণ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এলাকার হাওলাদার বাড়ির কাছে খালের পাড়ে ছোট এক খুপরি ঘরে দিন কাটে সত্তরের কোঠা পার করা শাহজাহান ও তার ষাটোর্ধ্ব স্ত্রী রাবেয়া বেগমের। ঘরটির চারপাশ ঘিরে শুধুই অথৈ জলরাশি। কিন্তু সেই পানি ব্যবহারের অযোগ্য। লোনা পানির আগ্রাসনে জনজীবন যেমন স্থবির হয়ে পড়েছে, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।

এক সময় যে ভিটেমাটিতে তারা সুখের সংসার গড়েছিলেন, আজ তা স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডবে কৃষি জমি তলিয়ে গেছে, মিষ্টি পানির উৎসগুলো হারিয়েছে তার গুণাগুণ। চারিদিকে লোনা পানির বিস্তার ঘটায় চাষাবাদের উপায় নেই, দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজেও এই পানি ব্যবহার করা অসম্ভব। রাবেয়া বেগমের মতো প্রবীণ নারীরা দিনভর ঘরের দাওয়ায় বসে থাকেন, তাকিয়ে থাকেন দিগন্তজোড়া সেই বিষাক্ত জলরাশির দিকে। তাদের এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণ আর কিছুই নয়, একটু স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা। কিন্তু বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ এই দম্পতি এখন কার্যত অসহায়। নিজেদের সবটুকু সম্বল হারিয়ে তারা আজ নিঃস্ব।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব কেবল শাহজাহান বা রাবেয়া বেগমের একার সমস্যা নয়। সাতক্ষীরার মতো উপকূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে শত শত প্রবীণ পরিবার আজ একই বাস্তবতার মুখোমুখি। তরুণ প্রজন্ম জীবিকার সন্ধানে শহরে পাড়ি জমালেও বয়সের ভারে ন্যুব্জ প্রবীণরা এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়া, পুষ্টিহীনতা আর সুপেয় পানির অভাবে দিন দিন শারীরিক অসুস্থতা বাড়ছে তাদের। অথচ এই বয়সে তাদের একটু প্রশান্তিতে থাকার কথা ছিল। কিন্তু লোনা পানির আগ্রাসন তাদের জীবনের শেষ অধ্যায়কে করেছে অনিশ্চিত ও যন্ত্রণাময়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এই সংকট নতুন নয়, তবে এর তীব্রতা সময়ের সঙ্গে বাড়ছে। লোনা পানির কারণে কৃষিনির্ভর এই অর্থনীতিতে এখন চাষাবাদ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেকেরই আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। প্রবীণরা যারা আজীবন কৃষি বা মৎস্য আহরণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা এখন হাত গুটিয়ে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তরুণরা বাইরে থেকে কিছুটা সহায়তা পাঠালেও প্রবীণদের দীর্ঘস্থায়ী পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে তারা দিনের পর দিন নিঃসঙ্গতা ও অবহেলায় জীবন কাটাচ্ছেন।

উপকূলের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর এই সংকট নিরসনে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের প্রয়োজন। কেবল ত্রাণ সহায়তা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জলবায়ু সহনশীল ঘরবাড়ি নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং প্রবীণদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, উপকূলের এই জনপদ থেকে হারিয়ে যাবে প্রবীণদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার। লোনা পানির নিচে তলিয়ে থাকা সেই ছোট্ট খুপরি ঘরগুলোর সামনে বসে থাকা প্রবীণরা আজ কেবল সময়ের সাক্ষী হয়েই বেঁচে আছেন, যার পাশে দাঁড়িয়ে দেখার মতো মানুষের বড্ড অভাব।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন