দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রায় দিয়েছেন উচ্চ আদালত। সম্প্রতি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্পষ্ট করেছেন যে, চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত কোনো খতিয়ানে জমির মালিকানা নিয়ে যদি বিরোধ দেখা দেয়, তবে শুধুমাত্র প্রশাসনিক তদন্ত প্রতিবেদন বা সরকারি কোনো কর্মকর্তার আদেশের ভিত্তিতে সেই খতিয়ান সংশোধন বা পরিবর্তন করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ চূড়ান্তভাবে সমাধানের ক্ষমতা কেবল দেওয়ানি আদালতের রয়েছে এবং বিচারিক আদালতের রায় বা ডিক্রি ছাড়া খতিয়ান সংশোধন করা যাবে না।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণত দেখা যায়, মাঠ পর্যায়ে অনেক সময় খতিয়ান সংশোধনের জন্য প্রশাসনিক তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আদেশকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জটিলতা সৃষ্টি করে। কিন্তু হাইকোর্টের বর্তমান অবস্থানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, খতিয়ান বা রেকর্ড সংশোধন কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং এটি মালিকানা স্বত্বের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই জমির প্রকৃত মালিকানা নিরূপণে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করার সুযোগ আইনে নেই।
বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চূড়ান্ত প্রকাশিত খতিয়ান (Record of Rights) কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিতে পরিবর্তনযোগ্য নয়। যদি কোনো খতিয়ানে ভুল থাকে বা জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অবশ্যই দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করে মালিকানার বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে। আদালত থেকে যখন মালিকানা সংক্রান্ত চূড়ান্ত ডিক্রি পাওয়া যাবে, কেবল তখনই সেই ডিক্রির আলোকে খতিয়ান সংশোধনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব। প্রশাসনিক কোনো অনুসন্ধানের ভিত্তিতে খতিয়ানে হস্তক্ষেপ করা হলে তা আইনত অবৈধ বলে গণ্য হবে।
আইনজীবীদের মতে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের জন্য বড় শিক্ষা। প্রায়ই দেখা যায়, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রভাবশালী মহল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে খতিয়ান পরিবর্তনের চেষ্টা করে। হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে এখন থেকে আর কেউ কোনো তদ্বির বা প্রশাসনিক আদেশের জোরে অন্যের জমির খতিয়ান নিজের নামে বা নিজের অনুকূলে সংশোধন করতে পারবে না। এটি ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
এছাড়া, চূড়ান্ত খতিয়ান সংশোধনের ক্ষেত্রে গেজেট নোটিফিকেশন ও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাও যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। কোনো কর্তৃপক্ষ বা কর্মকর্তা আইনের এই বিধান লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ থাকবে। ভূমি সংক্রান্ত এই রায় সারাদেশে ভূমি অফিসগুলোতে খতিয়ান সংশোধনের নামে চলা অনিয়ম ও দুর্নীতির পথ অনেকটাই বন্ধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আদালত পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, কোনো নথির বা রেকর্ডের শুদ্ধতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু সেই শুদ্ধতা যেন কোনোভাবেই প্রকৃত মালিকানা অস্বীকারের কারণ না হয়।
সামগ্রিকভাবে, হাইকোর্টের এই রায় জমির মালিকানার নিরাপত্তা ও আইনি জটিলতা নিরসনে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখন থেকে ভূমি সংক্রান্ত কোনো বিরোধ দেখা দিলে সাধারণ মানুষকে আর অহেতুক প্রশাসনিক জটিলতায় সময় নষ্ট না করে সরাসরি আইনের আশ্রয় নিতে হবে। আদালতের এই নির্দেশনা কার্যকর হলে ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা যেমন কমবে, তেমনি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে খতিয়ান পরিবর্তনের অপচেষ্টাও বহুলাংশে হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ