রাজউকের ১৪১৩ প্লট নিয়ে তোলপাড়, অনিয়মের অভিযোগে হাজারো নথি স্থগিত

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:১৪ পূর্বাহ্ণ

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের আওতাধীন বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের চিত্র এবার প্রকাশ্যে এসেছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে রাজধানীর পাঁচটি আবাসিক এলাকা এবং নতুন শহর প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া ১ হাজার ৪১৩টি প্লটের বিষয়ে বিশদ তদন্ত ও পর্যালোচনা শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এসব প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর নড়েচড়ে বসেছে নীতিনির্ধারকরা। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত ১ হাজার ৪১৩টি প্লটের মধ্যে ১ হাজার ৭৪টি প্লটেই বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এসব প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী মহলের প্রভাব খাটিয়ে রাজউকের জমি বরাদ্দের নিয়ম লঙ্ঘন করে এসব প্লট হস্তগত করা হয়েছিল। বর্তমানে এসব অনিয়মের বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অনিয়মের কবলে পড়া এসব প্লটের বিপরীতে থাকা যাবতীয় নথিপত্র ও কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট প্লট মালিকদের বা বরাদ্দগ্রহীতাদের সকল ধরনের লেনদেন ও স্থানান্তর প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ রয়েছে।

সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, স্থগিত হওয়া ১ হাজার ৭৪টি প্লটের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি জুড়ে রয়েছে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। এই প্রকল্পের মোট ৮৭৪টি প্লটে নানা ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পের আরও ২০০টি প্লটের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বরাদ্দের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ না করা, অযোগ্য ব্যক্তিদের প্লট প্রদান এবং প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের নামে জমি বরাদ্দ দেওয়া। রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রকল্পে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় জনমনে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং সরকারি এই সংস্থাটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কর্তৃপক্ষের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ে ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিদের ইচ্ছাতেই বেশিরভাগ বরাদ্দ পরিচালিত হয়েছে। সাধারণ আবেদনকারী বা যোগ্য প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ এখন প্রতিটি প্লটের বরাদ্দ প্রক্রিয়া পুনরায় খতিয়ে দেখছে। অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তি এবং যদি রাজউকের কোনো কর্মকর্তা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। আপাতত নথি স্থগিত রাখা হলেও তদন্ত শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব প্লটের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।

রাজউকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তের এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে সময় প্রয়োজন। যেসব প্লটের বিষয়ে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা বা আইনানুগ ভিত্তি পাওয়া যাবে না, সেসব বরাদ্দ বাতিল করার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তারই অংশ হিসেবে এই উদ্যোগকে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, রাজউকের দুর্নীতিমুক্ত হতে হলে কেবলমাত্র প্লট স্থগিত বা বাতিল করাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে, এই ঘটনার ফলে রাজউকের অন্যান্য প্রকল্পের গ্রহীতাদের মধ্যেও এক ধরনের উৎকণ্ঠা কাজ করছে। সবাই এখন অপেক্ষা করছেন তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন