রাস্তার ধারের খাবারের দোকান, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেগুলোকে এবার সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। পিঠা, পুরি, শরবত কিংবা বিবিধ মুখরোচক খাবারের এই অস্থায়ী দোকানগুলো এতদিন মূলত অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীনভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। এখন থেকে এই খাতের কর্মীদের এবং ব্যবসাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক পরিধি যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর একটি সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাস্তার ধারের খাবার বা স্ট্রিট ফুড আমাদের দেশের একটি বড় অংশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ এই দোকানগুলো থেকে খাবার গ্রহণ করেন। তবে এই খাবারগুলো প্রস্তুত ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু হলে এই দোকানগুলোতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং খাদ্যের মান নিশ্চিত করার জন্য একটি তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে বিক্রেতারাও একটি বৈধ স্বীকৃতি পাবেন, যা তাদের ব্যবসা পরিচালনায় বাড়তি সুবিধা বা নিরাপত্তা দিতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মতো এই স্ট্রিট ফুড খাতটিকে যদি যথাযথভাবে নিবন্ধিত করা যায়, তবে তা দেশের অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক আকার বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বর্তমানে রাস্তার ধারের বেশিরভাগ ব্যবসাই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। নিবন্ধনের মাধ্যমে এই উদ্যোক্তাদের তথ্যের আওতায় আনা সম্ভব হলে তাদের জন্য পরবর্তীতে ব্যাংক ঋণ সুবিধা বা অন্যান্য সরকারি সহায়তা পাওয়ার পথ সুগম হবে। এটি কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং এই খাতের উন্নয়নেও একটি মাইলফলক হতে পারে।
তবে এই প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও কম নয়। রাস্তার ধারের অধিকাংশ ব্যবসায়ীই স্বল্প পুঁজি নিয়ে কাজ করেন এবং তাদের অনেকেই অক্ষরজ্ঞানহীন বা ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি যেন সহজ এবং ঝামেলামুক্ত হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন নিবন্ধন বা জটিল প্রক্রিয়ার বদলে স্থানীয় পর্যায় থেকে যদি এই নিবন্ধন সম্পন্ন করা যায়, তবে তা আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া, নিবন্ধন করতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে কেবল অর্থনৈতিক হিসাবই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের মানোন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। রাস্তার পাশের দোকানগুলোর খাবারের মান ও পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত হলে ফুড-পয়জনিং বা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই কমে আসবে। একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে রাস্তার ধারের খাবার বিক্রয়কেন্দ্রগুলোকে নিয়ে আসতে পারলে শহরগুলোর সৌন্দর্য এবং নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে বলেও অনেকে মনে করছেন।
পরিশেষে, রাস্তার ধারের খাবারের দোকানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার বিষয়টি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। এটি বাস্তবায়িত হলে যেমন একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ পাবেন স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়ার নিশ্চয়তা। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি যেন অত্যন্ত মানবিক এবং বাস্তবসম্মত উপায়ে সম্পন্ন করা হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই উদ্যোগের রোডম্যাপ তৈরি করে এবং ব্যবসায়ীদের তাতে কীভাবে সম্পৃক্ত করে, তা নিয়ে এখন জনমনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ