একটি আদর্শ পরিবারের চিত্র বলতে আমরা বুঝি যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সহমর্মিতা অটুট থাকে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় পরিবারের ভেতরকার পরিবেশ এতটা সৌহার্দ্যপূর্ণ থাকে না। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের ছোট-বড় যেকোনো সমস্যার জন্য তাদেরকেই দায়ী করা হয়। ভাইবোনের সঙ্গে ঝগড়া, মা-বাবার মন খারাপ কিংবা বাড়িতে ঘটে যাওয়া যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে আঙুল ওঠে নির্দিষ্ট সেই সদস্যের দিকেই। দিনের পর দিন এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সেই ব্যক্তি একসময় নিজের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন এবং নিজেই নিজেকে সমস্যার মূল উৎস ভাবতে বাধ্য হন।
পরিবারের সদস্যদের এমন আচরণকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় অনেক সময় ‘স্কেপগোটিং’ বা বলির পাঁঠা বানানো বলা হয়। অর্থাৎ, পরিবারের অন্য সদস্যদের নিজেদের ব্যর্থতা, হতাশা বা অস্থিরতার দায়ভার অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়। যখন পরিবারের কোনো ব্যক্তি নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না বা নিজেদের ভুলের মুখোমুখি হতে ভয় পান, তখন তারা ঘরে থাকা সবচেয়ে সংবেদনশীল বা শান্ত মানুষটিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ফেলেন। এভাবে দোষারোপ করার মাধ্যমে তারা নিজেদের দায়মুক্তি খুঁজতে থাকেন।
এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো ‘গ্যাসলাইটিং’। যখন আপনি নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন বা প্রতিবাদ করবেন, তখন আপনাকে বলা হবে আপনি বেশি সংবেদনশীল বা সবকিছু বাড়িয়ে বলছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ তোলা হয় যে আপনি নিজেই অহেতুক সমস্যা তৈরি করছেন। বারবার শুনতে শুনতে একসময় আপনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে সত্যিই বোধহয় ভুল আপনারই। এই বিভ্রান্তি থেকেই তৈরি হয় তীব্র আত্মশুদ্ধি এবং মানসিক বিষণ্নতা। একজন মানুষ যখন বুঝতে পারেন না যে দোষটি আসলে তার নয়, বরং এটি পারিবারিক সিস্টেমের একটি ত্রুটি, তখন তার ব্যক্তিত্বে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পরিবারের এই বিষাক্ত চক্র থেকে বের হয়ে আসার উপায় সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রথমত আপনাকে বুঝতে হবে যে অন্যদের আচরণের দায় আপনার ওপর বর্তায় না। যদি পরিবারের অন্য কেউ কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে, তবে সেই ঝগড়া বা অশান্তির দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের ব্যক্তিগত সীমানা বা বাউন্ডারি তৈরি করা এখানে সবচেয়ে জরুরি। যখনই আপনাকে অন্যায্যভাবে আক্রমণ করা হবে, তখন শান্ত থেকে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া অথবা স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা শিখতে হবে।
নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে এই ধরনের বিতর্কিত আলোচনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া অনেক সময় কার্যকর সমাধান হতে পারে। মনে রাখবেন, পরিবারের সব সমস্যার সমাধান আপনার একার হাতে থাকার কথা নয়। যদি নিজের পরিবারের সদস্যদের আচরণ আপনার মানসিক শান্তি নষ্ট করে দেয়, তবে প্রিয়জনদের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা বা নিজের আবেগকে গুরুত্ব দেওয়া কোনো অন্যায় নয়। নিজের ওপর সন্দেহ না করে বরং পরিস্থিতির দিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে তাকানোর চেষ্টা করুন।
দীর্ঘমেয়াদী পারিবারিক এই অশান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে অনেক সময় কাউন্সেলিং বা থেরাপির সহায়তা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। নিজের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে একটি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাই হলো মূল লক্ষ্য। কোনোভাবেই নিজেকে ছোট বা ভুল মনে করবেন না। অনেক সময় পরিবারে নিজের যোগ্য অবস্থান তৈরি করতে বা প্রাপ্য সম্মান পেতে দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রয়োজন হয়। তবে সেই লড়াই যেন নিজের মানসিকতাকে ধ্বংস না করে দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রতিটি মানুষের একান্ত দায়িত্ব। পরিবারের অংশ হওয়া মানেই অন্যের সব অন্যায়ের দায়ভার গ্রহণ করা নয়, বরং নিজেদের মধ্যে সুস্থ এবং সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলাই হলো প্রকৃত পারিবারিক শিক্ষা।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:১৪ পূর্বাহ্ণ