খাবার খাওয়া একটি স্বাভাবিক ও তৃপ্তিদায়ক বিষয়। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খাওয়ার সময় বা খাবার গ্রহণের ঠিক পরপরই মুখমণ্ডল, গলা কিংবা কপালের চারপাশ দিয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরতে দেখা যায়। এমনকি খাবারের ঘ্রাণ নাকে এলেও অনেকের ঘাম শুরু হয়ে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ শারীরিক অবস্থাকে বলা হয় গাস্টেটরি সোয়েটিং। এটি অনেকের কাছেই বেশ অস্বস্তিকর এবং বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। তবে কেন এই অদ্ভুত সমস্যা হয় এবং এটি কি কোনো গুরুতর রোগের সংকেত, তা নিয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
আমাদের শরীরের ঘাম নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াটি মূলত অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম বা স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। কোনো কারণে এই স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটলে বা এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। খাওয়ার সময় অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার অন্যতম একটি প্রধান কারণ হলো ডায়াবেটিস। দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যার ফলে খাবার খাওয়ার সময় ঘামের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
ডায়াবেটিস ছাড়াও আরও কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে গাস্টেটরি সোয়েটিং হতে পারে। শরীরে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা হরমোনজনিত জটিলতা এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়া কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় এ ধরণের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আমাদের মুখের কাছে প্যারোটিড নামক লালাগ্রন্থি রয়েছে। কোনো দুর্ঘটনার কারণে বা চিকিৎসার প্রয়োজনে এই গ্রন্থিতে অস্ত্রোপচার করা হলে স্নায়বিক সংযোগে জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তীকালে খাওয়ার সময় ঘামের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেলস পালসি থেকে সেরে ওঠার পরও অনেক রোগীর ক্ষেত্রে মুখে এমন অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার নজির রয়েছে।
সাধারণত ঝাল খাবার খেলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং ঘাম হওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ঝাল জাতীয় খাবার না খাওয়া সত্ত্বেও যদি খাওয়ার টেবিলে বসলেই ঘাম হতে থাকে, তবে একে সাধারণ শারীরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। এক্ষেত্রে শরীরে বিদ্যমান কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করে এই লক্ষণ।
এই ধরনের সমস্যার সমাধানে প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো এর মূল কারণ খুঁজে বের করা। যদি সমস্যাটি ডায়াবেটিসের কারণে হয়ে থাকে, তবে রক্তে শর্করার মাত্রা কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কেবল শর্করার মাত্রা ঠিক রাখলেই অনেক ক্ষেত্রে ঘামের তীব্রতা কমে আসে। আবার হরমোনের সমস্যার কারণে হলে হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হয়।
চিকিৎসকরা অনেক সময় লক্ষণ অনুযায়ী প্রিগাবালিন বা অ্যামিট্রিপটাইলিনের মতো স্নায়বিক সমস্যার ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধ গ্রহণ করা যাবে না। ওষুধের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা আক্রান্ত স্থানে বটুলিনাম টক্সিন প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা ঘাম নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে।
খাওয়ার সময় অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার সমস্যাটি যদি আপনার নিয়মিত সঙ্গী হয়, তবে একে অবহেলা করবেন না। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করলে এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:১৪ অপরাহ্ণ