কর্মসংস্থান ধরে রাখতে জরায়ু অপসারণের চরম ঝুঁকিতে ভারতের নারী শ্রমিকরা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:১৪ অপরাহ্ণ

ভারতের আখ চাষের বিশাল কর্মযজ্ঞে যুক্ত নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ অত্যন্ত মানবেতর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। জীবিকার তাগিদে, বিশেষ করে ঋণের বোঝা শোধ করার উদ্দেশ্যে তারা তাদের নিজেদের বসতবাড়ি থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে পাড়ি জমান। কিন্তু আখ কাটার মৌসুমী এই শ্রমের বাজারে টিকে থাকা তাদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, কাজ ধরে রাখার জন্য অনেক নারী শ্রমিক স্বেচ্ছায় তাদের জরায়ু অপসারণের মতো জটিল অস্ত্রোপচারের আশ্রয় নিচ্ছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের তথ্যের বরাতে এই বিষয়টি সম্প্রতি নতুন করে জনসমক্ষে উঠে এসেছে।

কর্ণাটকের রামানালের মতো প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় আখ কাটার মৌসুমে দৃশ্যপট অত্যন্ত কঠোর হয়। ভোর চারটা না বাজতেই এই নারী শ্রমিকদের দিনের কাজ শুরু হয়ে যায়। সেখানে গড়ে ওঠা অস্থায়ী তাবুগুলোতে তাদের জীবন অতিবাহিত হয়। পরিবারের অন্যান্য পুরুষ সদস্যের জেগে ওঠার আগেই তারা তাদের দৈনন্দিন কাজ এবং ব্যক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন, কারণ দিনের পুরোটা সময় তাদের কাটাতে হয় আখ ক্ষেতের রূঢ় পরিবেশে। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম এবং অনিয়মিত জীবনযাত্রার কারণে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়ে, তবে এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো তাদের জরায়ু অপসারণের হার বেড়ে যাওয়া।

দীর্ঘ সময় ধরে আখ ক্ষেতে কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের ফলে এই নারীদের শরীর নানা জটিলতায় ভোগে। বিশেষ করে মাসিকের সময় তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কাজের জায়গায় শৌচাগারের সুবিধা না থাকা এবং দীর্ঘক্ষণ পানিতে দাঁড়িয়ে বা রোদে পুড়ে কাজ করার ফলে তারা নানা ধরনের সংক্রমণের শিকার হন। কিন্তু আখ কাটার কাজে বিরতি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একদিন কাজ থেকে দূরে থাকা মানেই তাদের আয়ের বড় অংশ হারিয়ে যাওয়া, যা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তোলে। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই তারা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের খোঁজে জরায়ু অপসারণের মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতে প্রায় পনেরো লাখ মানুষ আখ উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এর মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যাও বিশাল। যদিও তাদের এই জরায়ু অপসারণের নেপথ্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো জরুরি প্রয়োজন নেই, বরং এটি সম্পূর্ণরূপে অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার বহিঃপ্রকাশ। চিকিৎসকদের মতে, এই নারীরা যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান, তা কেবল শারীরিক নয়, বরং মানসিক এবং সামাজিক চাপের একটি সম্মিলিত রূপ। ঋণের বোঝা মেটাতে তারা এমন এক চক্রে জড়িয়ে পড়েছেন যে, সেখানে নিজের দেহের বিনিময়ে জীবিকা অর্জনের ভয়াবহ পথ বেছে নিতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই চরম অবনতি কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করে কেবল তাদের শারীরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে উৎপাদন ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া অমানবিক। আখ চাষের এই বিশাল কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য নুন্যতম স্বাস্থ্যবিধি, শৌচাগার এবং বিশ্রামের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তারা এই ধরনের চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের উচিত এই নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা এবং তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নতুবা আখ চাষের এই সোনালী শিল্পের পেছনে লুকিয়ে থাকবে অগণিত নারীর ত্যাগের এক অন্ধকার ইতিহাস।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন