দেশের জ্বালানি খাতের সংকট নিরসনে ও নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে দেশের অন্যতম প্রধান গ্যাসক্ষেত্র তিতাসে নতুন দুটি কূপ খনন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নেওয়া এই উদ্যোগ সফল হলে জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্যাসের সরবরাহ যুক্ত হবে, যা শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, এই দুটি কূপ খননের জন্য বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদার যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় এই প্রকল্পটি একটি মাইলফলক হতে পারে। জ্বালানি বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের এই উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসফিল্ডটি বাংলাদেশের অন্যতম পুরনো ও প্রধান গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। বছরের পর বছর এখান থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের মজুদ হ্রাস পাওয়ার কারণে এবং নতুন গ্যাসের সন্ধানে এই কূপ খননের বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। প্রযুক্তিগত জরিপ ও ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা নতুন কূপ খননের জায়গাগুলো নির্বাচন করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খননকার্য সম্পন্ন করা হবে, যাতে মাটির গভীরে থাকা গ্যাসের স্তরে সঠিকভাবে পৌঁছানো যায়।
প্রকল্পের আওতায় ৫৯২ কোটি টাকার মধ্যে যন্ত্রপাতি আমদানি, খনন কাজ, পাইপলাইন সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী বছরগুলোতে গ্যাসের উৎপাদন সক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানো। নতুন এই দুটি কূপ থেকে দৈনিক কী পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাবে, তা খনন কাজ শেষ হওয়ার পর চূড়ান্তভাবে জানা যাবে। তবে ভূতাত্ত্বিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বেশ আশাবাদী। তারা মনে করছেন, এই কূপগুলো চালু হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রবাহে নতুন গতি আসবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়ক হবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে গ্যাসের যে চাহিদা রয়েছে, তা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বিতরণকারী সংস্থাগুলো। শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পাওয়ার ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়। এই বাস্তবতায় তিতাসের নতুন কূপ খনন প্রকল্পটির গুরুত্ব অপরিসীম। আমদানিকৃত গ্যাসের উচ্চমূল্যের তুলনায় নিজস্ব উত্তোলন অনেক সাশ্রয়ী। তাই সরকার এখন বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির চেয়ে নিজস্ব কূপ খনন ও অনুসন্ধান কাজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং ঠিকাদার নির্বাচনের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে মাঠ পর্যায়ে খনন কাজ শুরু করা হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে এ ধরণের প্রকল্পগুলোর কোনো বিকল্প নেই। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের সক্ষমতা বাড়াতে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জ্বালানি খাতের অংশীজনরা। প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে জ্বালানি খাতে দেশের নির্ভরতা অনেকাংশে কমবে এবং উৎপাদন খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর নজরদারি রাখা হবে বলে জানা গেছে। সময়মতো কাজ শেষ করা এবং গুণগত মান বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। তিতাসের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রেও অনুরুপ অনুসন্ধান ও উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারের লক্ষ্য হলো দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে জ্বালানি খাতের অস্থিরতা কমিয়ে আনা। এখন দেখার বিষয়, কত দ্রুত এই কূপ খনন কাজ শেষ করে গ্যাস উত্তোলনের পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:১৪ অপরাহ্ণ