ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল পরিসরে নাগরিক অধিকারের চর্চা নিয়ে বিশ্বব্যাপী নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস। সম্প্রতি সংস্থাটির প্রকাশিত ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৬’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান ডিজিটাল পরিস্থিতির একটি চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আগের তুলনায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই উন্নতির পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যম ও ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নানা ঝুঁকি ও উদ্বেগের বিষয়গুলোও উঠে এসেছে বিশ্লেষণে।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের তুলনায় বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ও প্রসারের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ডিজিটাল অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচকের নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডে এই উন্নতির প্রতিফলন ঘটেছে। সাধারণ নাগরিকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগও বিস্তৃত হয়েছে। তবে এই স্বাধীনতার চর্চা করতে গিয়ে দেশের ডিজিটাল ও গণমাধ্যম কর্মীরা যে ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন, তা নিয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে ফ্রিডম হাউস।
প্রতিবেদনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংবাদকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি। ফ্রিডম হাউসের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্যপ্রবাহ ও সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা এখনো বিদ্যমান। গণমাধ্যমকর্মীরা প্রায়ই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা অনলাইন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে চাপের মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং সরকারের সমালোচনা করে কোনো সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পরিসরে কঠোর নজরদারি ও বাধার সম্মুখীন হতে হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে একটি বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
ইন্টারনেট স্বাধীনতার সূচকে কোনো দেশের অবস্থান কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা কীভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে, সেটিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের ফলে সূচকে কিছুটা উন্নতি হলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সরকার ও প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে নানা ধরনের চাপ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যা সামগ্রিক ইন্টারনেট স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইন্টারনেট স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল পেতে হলে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়। এজন্য প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ, ভিন্নমত প্রকাশের সুরক্ষা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে সংবাদপত্রের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। ফ্রিডম হাউসের এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে এল, যখন সারা বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল অধিকার ও তথ্যের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ইন্টারনেট স্বাধীনতার সুরক্ষা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্যও জরুরি।
প্রতিবেদনে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ডিজিটাল দুনিয়ায় সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বিভিন্ন সময় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস বা নজরদারির অভিযোগগুলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ডিজিটাল পরিসর যেন ভয়ের জায়গা না হয়ে বরং সৃজনশীলতা ও মত প্রকাশের উর্বর ক্ষেত্র হয়, সেদিকে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। পরিশেষে, ফ্রিডম হাউসের এই প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর জন্য একটি বার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে, যাতে ডিজিটাল বিশ্বে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়নের গতিকে আরও বেগবান করা যায়।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ