বন্ধ শিল্পের সম্পদ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ

দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের শিল্পক্ষেত্রের অদক্ষতা ও বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে। বিশেষত, সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ও শিল্প সমিতির মধ্যে বন্ধ শিল্পের অবশিষ্ট সম্পদকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানো এবং বেকারত্ব কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হয়েছে।

বহু বছর ধরে অপ্রচলিত বা বন্ধ অবস্থায় থাকা কারখানা, গুদাম ও উৎপাদন লাইনগুলোতে ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করা মূলধন, মেশিনারি ও মানবসম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদকে পুনরায় সক্রিয় করা হলে নতুন পণ্য উৎপাদন, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত পোষণ করছেন।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, বন্ধ শিল্পের অবকাঠামো পুনরায় ব্যবহার করলে নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে, ফলে উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে। পাশাপাশি, বিদ্যমান কর্মী ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার শিল্প পুনরুজ্জীবনের জন্য নীতি নির্ধারণে ত্বরান্বিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি নথিতে বলা হয়েছে, বন্ধ শিল্পের সম্পদকে পুনরায় ব্যবহার করার জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা, কর রেহাই এবং সহজতর অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রদান করা হবে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট শিল্পক্ষেত্রের জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা হবে, যাতে কর্মীশক্তি নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, পূর্বে টেক্সটাইল শিল্পে বন্ধ হয়ে থাকা একটি কারখানা, যেখানে আধুনিক মেশিনারি ও প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে, তা পুনরায় চালু করা হলে দেশীয় ও রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। একইভাবে, ধাতু ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পে বন্ধ থাকা গুদামগুলোকে লজিস্টিক হাব হিসেবে ব্যবহার করা হলে সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী হবে।

শিল্প সমিতির প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বলছেন, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ওপর। তারা প্রস্তাব করছেন, বন্ধ শিল্পের সম্পদ তালিকা তৈরি করে তা একটি ডাটাবেসে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা সহজে তথ্য পেতে পারেন। এছাড়া, বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।

কর্মসংস্থান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বন্ধ শিল্পের পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ায় সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লক্ষ লক্ষ কর্মীর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষত, গ্রামীণ ও শিল্পবিহীন অঞ্চলে এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক হবে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বেকারত্বের হার ৪.২% এবং এই সংখ্যা কমাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো অপরিহার্য।

অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বন্ধ শিল্পের সম্পদ পুনরায় ব্যবহার করলে দেশের মোট দেশীয় উৎপাদনে (GDP) প্রায় ১.৫% পর্যন্ত অবদান রাখতে পারে। এছাড়া, রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাবে।

তবে, এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, বন্ধ শিল্পের সম্পদের অবস্থা মূল্যায়ন ও পুনর্নির্মাণের জন্য যথাযথ তদারকি প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি হ্রাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার, যাতে তারা পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রমে অংশ নিতে উৎসাহিত হয়। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি।

এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে কয়েকটি pilot project চালু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা-নোয়াখালী সীমানায় অবস্থিত একটি বন্ধ গার্মেন্টস কারখানা পুনরায় চালু করার জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রথম ত্রৈমাসিকের ফলাফল ইতিবাচক, যেখানে ২০০ টিরও বেশি কর্মীকে পুনরায় কর্মসংস্থান প্রদান করা হয়েছে এবং উৎপাদন ক্ষমতা ৭০% পর্যন্ত পুনরুদ্ধার হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, বন্ধ শিল্পের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর তাগিদ দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার, শিল্পক্ষেত্র ও শ্রমিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সঠিক নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল হতে পারে এবং দেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে পারে।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন