সময়টা ছিল ১ ডিসেম্বর,২০২৪।শীতের শুরু,হালকা কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যা।সামনে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা।পড়ার চিন্তায় কিছুই ভালো লাগছিলো না। তাই,বেরিয়ে পড়লাম বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষন আড্ডা দেওয়ার জন্য।আড্ডা ফাঁকে হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিলাম আজকে রাতেই ট্যুরের যাবো।যেই কথা সেই কাজ বেরিয়ে পড়লাম ৩ জন বন্ধু মিলে কমলাপুর রেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে।গন্তব্য কুলাউড়া।পৌঁছাতে একটু দেরি হওয়ায় রাত ১০ টার সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটা মিস করলাম।কি আর করার,ইচ্ছা না থাকার সত্ত্বেও সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।সেখান থেকে রাত ১১:৩০ এর রূপসী বাংলা বাসে উঠে বসলাম।ঠিক সকাল ৮ টায় বাস আমাদের কুলাউড়া নামিয়ে দিলো।কুলাউড়া থেকে আমাদের সাথে আর ২ জন সাথী যোগ হলো।রিজার্ভ সিএনজিতে করে আজগরাবাদ চা বাগানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম,গন্তব্য সিলেট বিভাগ এবং মৌলভীবাজার জেলার সর্বোচ্চ চূড়া কালা পাহাড়,যার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০৯৮ ফুট। স্থানীয়রা এ পাহাড়কে লংলার পাহাড় নামেও চিনে।
আজগরাবাদ চা বাগানের গেট থেকে হাটা শুরু করলাম।দুপাশে চায়ের বাগান আর মাঝখানে গ্রামীণ মেঠো পথ,সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। স্থানীয় মানুষজনকে রাস্তা জিজ্ঞেস করে সামনে আগাতে থাকলাম,একের পর এক বাঁশের সাকো পার হয়ে প্রায় ১ ঘণ্টা হাঁটার পর এসে পৌছালাম বেগুনছড়া পুঞ্জিতে।এটি একটি খাসিয়া পুঞ্জি।খাসিয়ারা গ্রামকে পুঞ্জি বলে থাকে।এই বেগুনছড়া পুঞ্জির পর থেকেই মূলত আসল পাহাড় ট্রেকিং শুরু।
ট্রেকিং এর শুরুতে পেলাম একটা ঝিরি পথ।ঝিরির পানির অনবরত বয়ে চলা ও কল কল ধনী যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। কোথাও উঁচু কোথাওনিচু ,কোথাও বা পিচ্ছিল খাড়াপথ।ঝিরির পানির মধ্যে দিয়ে হাঁটা এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। হাঁটার এক পর্যায়ে একটা খাড়া পথের সামনে এসে থামলাম,বুজলাম এবার খাড়া পাহাড় বাইতে হবে।পাহাড়ি খাড়া পথ বেয়ে অনেক পরিশ্রমের পর উপরে এসে পৌঁছলাম।এভাবেই একবার খাড়া আরেকবার ঢালু পথের মধ্য দিয়ে অনবরত হেঁটে চলেছি।অবশেষে অনেক কষ্টের পর একটা চূড়ায় এসে পৌছালাম কিন্তু ম্যাপে দেখানো কালা পাহাড়ের চূড়া আর এই চূড়া এক নয়।বুজলাম,পথ ভুল করেছি।অনেক খোঁজাখুজির পরেও কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একে তো পথ হারালাম তারউপর পাহাড়ি বুনো হাতির ভয় মনে বাসা বুনতে শুরু করলো। হঠাৎই আমাদের এক সাথী (ইউসুফ) অফলাইন ম্যাপ দেখে কালা পাহাড়ের চূড়ার উদ্দেশ্যে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটা শুরু করলো।আমিও চার পাঁচ না ভেবেই তাকে অনুসরণ করা শুরু করলাম।সেদিন পাহাড়ে আমরা ছাড়া কোনো অভিযাত্রী দল ছিল না। মনের মধ্যে চাপা ভয় ও উৎকন্ঠা নিয়ে রিজলাইন ধরে হাঁটছি তো হাঁটছি,এ পথ যেনো শেষ হবার নয়।অবশেষে,অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে প্রায় দুপুর ১ টা ১০ মিনিটের দিকে সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত কালা পাহাড়ের চূড়ার দেখা পেলাম।মনের মধ্যে এক অন্যরকম প্রশান্তি খুঁজে পেলাম।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও ফটোশুট শেষে আবার একই পথে ফিরতে শুরু করলাম।নামার পথ বেশিরভাগ সময়ই ঢালু ছিলো ,তাই পথ চিনতে অসুবিধা হয়নি।সন্ধ্যার পর আমরা কুলাউড়া এসে পৌছালাম।রাতে বাজারের আশে পাশে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করলাম এবং রাতের খাবার সেরে নিলাম। কুলাউড়ার বাজার এবং স্টেশনের আশে পাশে কিছু মধ্যম মানের হোটেল রয়েছে।ইচ্ছে করলে সেখানে রাত্রি যাপন করা যায়,এর মধ্যে হোটেল হলিডে এক্সপ্রেস এর রিভিউ সবচেয়ে ভালো।আমরা রাত ৯:৩০ এর রূপসী বাংলা বাসে করে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করি।
সতর্কতা:
১.পাহাড়ে দুপুরে দুপুরে খাবার মত কিছুই পাবেন না।তাই, আগে থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার নিয়ে যাবেন।
২.প্রত্যেকে সাথে অন্তত ১লিটার পানি নিবেন।
৩.শিশু এবং বয়স্কদের এ ভ্রমণে না যাওয়াই ভালো।
৪.ভালো মানের ট্রেকিং জুতা নিবেন।

ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশের সময়: Wednesday, 8 January, 2025 । 11:13 pm