রাঙামাটি জেলার পর্যটন কেন্দ্র সাজেকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটকবাহী যানবাহন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করেছে বলে নিশ্চিত করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। এই হামলার ফলে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে সেখানে বেড়াতে আসা প্রায় তিন হাজার পর্যটক দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়েন। পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর যৌথ তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার সকালের দিকে। সাজেকে পর্যটকদের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবং তাদের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ নিয়মিত টহল দিয়ে আসছিল। আইএসপিআর-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সকালে অবরোধকারীরা সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় ইউপিডিএফের স্থানীয় সদস্যরা সাধারণ জনগণকে জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ করে রাখে। এটি ছিল পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর পথে এক বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে সেনাবাহিনীর টহল দল ও পুলিশ সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে আলোচনার মাধ্যমে অবরোধকারীদের রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও জনদুর্ভোগ লাঘব করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
পরিস্থিতি যখন আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে ছিল, ঠিক তখনই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। আইএসপিআর-এর ভাষ্যমতে, সকাল পৌনে ১১টার দিকে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় অবরোধকারীরা হঠাৎ করেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এই অতর্কিত হামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ করে এবং অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল পর্যটকদের যানবাহনের জন্য রাস্তা পুনরায় উন্মুক্ত করা।
তবে পরিস্থিতি এখানেই শেষ হয়নি। সকাল ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটকদের জীবনের নিরাপত্তা ও নিজেদের আত্মরক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয়। এরপর সশস্ত্র ব্যক্তিরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। এরপর সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগে সড়ক থেকে প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে নেওয়া হয় এবং অবরুদ্ধ তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
পর্যটন মৌসুমে সাজেকে এই ধরণের সহিংসতা ও পর্যটকদের জিম্মি করার ঘটনা জনমনে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বজায় রাখতে এবং পর্যটনের মতো একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের নিরাপত্তায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বদ্ধপরিকর। পর্যটকদের কোনো প্রকার ক্ষতি ছাড়াই উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের সশস্ত্র তৎপরতা পর্যটন খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পর্যটকদের অবাধ চলাচল বজায় রাখতে তারা সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পর্যটকরা যেন নির্ভয়ে ভ্রমণ করতে পারেন, সেজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি পাহাড়ি অঞ্চলের বর্তমান অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরেছে এবং এই ঘটনার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:১৪ অপরাহ্ণ