ভারতের আসাম রাজ্যে সরকারি উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বাঙালি মুসলিম অধ্যুষিত বসতিগুলোতে প্রশাসনিক তৎপরতায় হাজার হাজার মানুষ তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছেন। সাম্প্রতিক এই উচ্ছেদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এবং স্থানীয় বিভিন্ন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্য ও পোস্টের মাধ্যমে জানা গেছে, এই অভিযানে কেবল বাড়িঘরই নয়, বরং ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলার গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।
প্রাথমিক তথ্যানুসারে, সরকারি অভিযানে প্রায় এক হাজার একশ’রও বেশি পরিবারকে তাদের পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই আর্থসামাজিক দিক থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত সময় বা পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আকস্মিকভাবে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ তাদের সহায়-সম্বল রক্ষার সুযোগ পাননি। শীতের এই সময়ে খোলা আকাশের নিচে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে অনেককে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগের তীর সরাসরি প্রশাসনের দিকে, যারা উন্নয়নের নামে বা সরকারি খাস জমি উদ্ধারের দোহাই দিয়ে তাদের উচ্ছেদ করেছে।
অভিযানের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটি হলো ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙার অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, উচ্ছেদ চলাকালীন এলাকায় থাকা কয়েকটি মসজিদও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকে একে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে এর বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন। যদিও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই ভাঙচুরের অভিযোগ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
আসামে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি জমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের নামে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক এই উচ্ছেদটি যে মাত্রায় হয়েছে, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, উন্নয়ন ও সরকারি জমি পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও, যেভাবে ধর্মীয় স্থাপনা ও বিপুল সংখ্যক পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, তা মানবাধিকারের প্রশ্নে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও পাল্টাপাল্টি দোষারোপ চলছে। একটি পক্ষ এটিকে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছে, অন্য পক্ষ এটিকে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে।
উচ্ছেদ পরবর্তী পরিস্থিতিতে ওই এলাকাগুলোতে থমথমে ভাব বিরাজ করছে। পর্যাপ্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে গৃহহীন করায় চরম সংকটে পড়েছেন তারা। স্থানীয় সমাজকর্মীরা বলছেন, সরকার উচ্ছেদের আগে অন্তত বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারত। কিন্তু সেই নিয়ম না মেনে হঠকারী পদক্ষেপে চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা এখন সরকারের কাছে পুনর্বাসন এবং ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রতিকার দাবি করছেন। পুরো বিষয়টি এখন আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে রয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, এই উচ্ছেদ অভিযানের জেরে দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:১৫ অপরাহ্ণ