জীবনের কঠিনতম সময়ে যখন সবাই হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দেখিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন মিতু আক্তার। তার এই সাফল্যের গল্প কোনো রূপকথার মতো মনে হলেও এর প্রতিটি পরতে মিশে আছে এক ভয়াবহ সংগ্রামের ইতিহাস। একপাশে অভাবের তাড়না, অন্যপাশে সন্তানের দায়িত্ব—এমন পরিস্থিতির মধ্যে ভাঙা ল্যাপটপ নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং জগতে পা রাখা সহজ ছিল না। কিন্তু ধৈর্যের সাথে সব বাধা জয় করে তিনি আজ কেবল নিজেই সফল নন, বরং তার অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি করেছেন এক নতুন প্রজন্মের পথপ্রদর্শক।
মিতুর শুরুর দিনগুলো ছিল চরম অনিশ্চয়তার। তখন হাতে ছিল একটি অচলপ্রায় ল্যাপটপ। টেকনিক্যাল জটিলতায় সেটি বারবার বন্ধ হয়ে যেত, কাজের মাঝখানে বাধা আসত প্রতিনিয়ত। অথচ সেই ল্যাপটপটিই ছিল তার উপার্জনের একমাত্র ভরসা। একই সঙ্গে তাকে সামলাতে হতো ছোট সন্তানকে। কোলের শিশুকে এক হাতে আগলে রেখে অন্য হাতে কিবোর্ডে টাইপ করে কাজ চালিয়ে যাওয়া মিতুর জন্য ছিল প্রতিদিনের রুটিন। অনেক রাত তিনি নির্ঘুম কাটিয়েছেন, কারণ দিনের বেলা সন্তানের দিকে নজর দেওয়ার পাশাপাশি কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। অগণিত মানুষের অবহেলা ও উপহাসের পাত্র হতে হয়েছে তাকে, তবুও তিনি দমে যাননি।
পরিশ্রম আর একাগ্রতা যে কখনো বৃথা যায় না, মিতু আক্তারের জীবনই তার বড় প্রমাণ। ধীরে ধীরে কাজের মান উন্নত করতে শুরু করেন তিনি। প্রতিকূল পরিবেশে কাজ শিখে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার পাশাপাশি তিনি ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে নিজের একটি অবস্থান তৈরি করেন। প্রযুক্তিগত বাধাগুলো কাটিয়ে যখন তিনি নিয়মিত কাজ পেতে শুরু করলেন, তখন তার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। ল্যাপটপটি ঠিক করার সামর্থ্য হওয়ার পর তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। এখন তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ক্লায়েন্টদের সাথে সফলভাবে কাজ করছেন এবং নিজের একটি শক্তিশালী ক্যারিয়ার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে মিতুর সাফল্যের সবচেয়ে বড় দিক হলো, তিনি শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেই থেমে থাকেননি। আজ তিনি হয়ে উঠেছেন অন্য অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। যে দশজন তরুণ-তরুণী জীবনের নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসার স্বপ্ন দেখেও হতাশায় নিমজ্জিত ছিল, তাদের মিতু আক্তার হাতে-কলমে পথ দেখাচ্ছেন। নিজের উপার্জনের একটি অংশ তিনি ব্যয় করছেন অন্যদের দক্ষতা উন্নয়নে। তার এই মানবিক উদ্যোগ তাকে কেবল একজন ফ্রিল্যান্সার নয়, বরং এক সমাজ পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রযুক্তির এই যুগে মিতু আক্তার প্রমাণ করেছেন যে, ল্যাপটপ কিংবা উচ্চমানের সরঞ্জাম সাফল্যের একমাত্র শর্ত নয়। প্রবল ইচ্ছা আর পরিস্থিতির সাথে লড়াই করার মানসিকতা থাকলে শূন্য থেকেও আকাশ ছোঁয়া সম্ভব। তিনি এখন অনেকের কাছেই একটি নাম, যার গল্পের প্রতিটি শব্দ সাহস যোগায়। ভবিষ্যতে তিনি তার এই কার্যক্রমকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান যাতে দেশের তরুণ সমাজ প্রযুক্তির দক্ষতাকে পুঁজি করে আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠতে পারে।
মিতুর এই পথচলা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, জীবনের যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি বা ব্যক্তিগত সংকট আসলে থামিয়ে দেওয়ার জন্য আসে না, বরং নতুন করে শুরু করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। সন্তান, সংসার এবং একই সাথে নিজের ক্যারিয়ার সামলানোর এক দারুণ ভারসাম্য তৈরি করে তিনি আজ এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। সমাজ পরিবর্তনের এই ধারা যেন আরও বিস্তৃত হয়, সেই লক্ষ্যেই মিতু আক্তার প্রতিনিয়ত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ । ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ