জন্মের মাত্র সাত দিন পর তীব্র ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। দিনে ৬০ থেকে ৭০ বার পাতলা পায়খানা হচ্ছিল বলে পরিবারের কাছ থেকে শোনা তাঁর সেই শৈশবের গল্পে উঠে এসেছে। বয়স এত কম, শরীরও নিতান্তই ছোট—এ অবস্থায় চিকিৎসকেরা তাঁর বাবা-মাকে বাঁচার আশা না রাখার কথা জানিয়েছিলেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে শিরায় স্যালাইন দেওয়া হয়, সঙ্গে দেওয়া হয় অক্সিজেন। সেই সংকট পেরিয়ে বেঁচে যান তিনি।
ঘটনাটির কোনো স্মৃতি তাঁর নিজের নেই। জীবনের প্রথম দিকের অনেক অভিজ্ঞতার মতো মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার ঘটনাটিও তিনি জেনেছেন বাবা-মায়ের মুখে। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পারিবারিক স্মৃতি তাঁর নিজের জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হয়ে ওঠে। তাঁর উপলব্ধি, জীবনের প্রথম সাত দিন পার হওয়ার পর পাওয়া প্রতিটি সময় যেন বাড়তি পাওয়া—একটি সুযোগ, যা অন্য কোনো পরিণতিও নিতে পারত।
১৯ অক্টোবর তাঁর ২৯তম জন্মদিন ছিল। বয়সের হিসাবের সঙ্গে তাই তাঁর মনে ফিরে এসেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন: বেঁচে থাকার জন্য পাওয়া এই অতিরিক্ত সময় তিনি কীভাবে কাজে লাগিয়েছেন? প্রশ্নটি কেবল জন্মদিনের আত্মজিজ্ঞাসা নয়; ছোটবেলায় প্রাণসংকটের অভিজ্ঞতা, পরবর্তী জীবনের হতাশা এবং বর্তমানের কাজ—সবকিছুর সঙ্গে তা জড়িয়ে আছে তাঁর বর্ণনায়।
তবে বেঁচে যাওয়ার গল্পটি তাঁর কাছে সব সময় অনুপ্রেরণার সহজ কোনো উপাখ্যান হয়ে ওঠেনি। তিনি লিখেছেন, ক্লান্তি ও অবসাদ অনেক দিন তাঁর ভাবনাকে ঘিরে রেখেছে। জীবনের নানা ধাক্কা ও মানসিক আঘাতের মধ্যে এমন সময়ও এসেছে, যখন বেঁচে থাকার ভার অসহনীয় মনে হয়েছে। শৈশবের অসুস্থতার কথা ভেবে কখনো তাঁর মনে হয়েছে, তখনই যদি জীবন থেমে যেত, তবে হয়তো এই ক্লান্তি থাকত না। এ অনুভূতির কথা তিনি অতীতের মানসিক সংকটের স্মৃতি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সাত-আট বছর আগের লেখা ও ডায়েরি ফিরে দেখলে, সে সময়ের নিজের মধ্যে তিনি পৃথিবীকে নিষ্ঠুরতার কারখানা হিসেবে দেখার প্রবণতা খুঁজে পান। তাঁর বর্ণনায়, জন্মের পর মানুষকে যেন এক অন্তহীন প্রতিযোগিতায় নামানো হয়: দক্ষতা বাড়ানো, নিজেকে প্রমাণ করা, কাজ শেষ করে আবার নতুন কাজের পেছনে ছোটা। প্রচলিত কর্মব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুনও তাঁর কাছে তখন ক্লান্তিকর এবং কৃত্রিম মনে হতো। মৃত্যু অবধারিত জেনেও মানুষ কেন এমন নিরন্তর পরিশ্রম করে—সেই প্রশ্নও তাঁকে ভাবাত।
এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর বর্তমানের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। শিরোনামে বলা হয়েছে, যে জীবাণু একসময় তাঁকে মেরে ফেলতে পারত, সেটিই এখন তাঁর ল্যাবের সঙ্গী। শৈশবে ওই জীবাণুর সংক্রমণ হয়েছিল—এমনটাই ঘটনার বর্ণনা থেকে বোঝা যায়; কিন্তু দেওয়া বিবরণে জীবাণুটির নাম, সংক্রমণ শনাক্ত করার পদ্ধতি কিংবা পরীক্ষাগারে তাঁর কাজের প্রকৃতি উল্লেখ করা হয়নি। তাই কোন জীবাণু বা কী ধরনের গবেষণার সঙ্গে তিনি যুক্ত, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
তবু শিরোনামের এই উল্টো সম্পর্কটিই অভিজ্ঞতার তাৎপর্য সামনে আনে: একসময় যে জীবাণু ছিল প্রাণহানির আশঙ্কার অংশ, বহু বছর পর সেটিই তাঁর কর্মজগতের সঙ্গে যুক্ত। অতীতের অসুস্থতা ও বর্তমানের ল্যাবের মধ্যে কোনো সরল, নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক যোগসূত্রের দাবি না করেও বলা যায়, একই বিষয়কে জীবনের ভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ আলাদা অবস্থান থেকে দেখা সম্ভব। শৈশবে তিনি ছিলেন অসুস্থ শিশু; এখন সেই জীবাণু তাঁর ল্যাবজীবনের পরিচিত সঙ্গী—শিরোনামের বক্তব্যে এই পরিবর্তনই স্পষ্ট।
তাঁর বর্ণনায় বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটি কোনো একক মুহূর্তে তৈরি হওয়া স্থির আশাবাদের গল্প নয়। বরং সেখানে আছে কৃতজ্ঞতা ও ক্লান্তি, জীবনকে উপহার ভাবা এবং কখনো সেই জীবনকেই ভারী মনে হওয়া—দুই বিপরীত অনুভূতি। জন্মদিনে ফিরে দেখা অতীত তাঁকে নিজের পাওয়া সময়ের হিসাব করতে শেখায়, কিন্তু সেই হিসাবের উত্তর সহজ নয়। কী করলেন, কী করতে চান, কিংবা জীবনকে কীভাবে অর্থবহ মনে হয়—এসব প্রশ্নের সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জড়িয়ে থাকে।
প্রাণসংকট থেকে ফিরে আসার পর তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যে মসৃণ ছিল, এমন দাবি তিনি করেননি। বরং নিজের পুরোনো লেখালেখি, হতাশা ও বেঁচে থাকার ক্লান্তির কথাও সামনে এনেছেন। সেই খোলামেলা স্মরণ করিয়ে দেয়, কোনো কঠিন অসুস্থতা থেকে বেঁচে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে পরবর্তী জীবনে দুঃখ বা মানসিক সংকট থাকবে না। তাঁর গল্পে বেঁচে থাকা একদিকে চিকিৎসার সহায়তায় পাওয়া বাস্তব ঘটনা, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকা ব্যক্তিগত উপলব্ধি।
২৯তম জন্মদিনে ফিরে দেখা সেই সাত দিনের জীবনসংকট তাই কেবল অতীতের চিকিৎসা-ঘটনা নয়। তা তাঁর কাছে বেঁচে থাকার সময়, সেই সময়ের মূল্য এবং কাজের অর্থ নিয়ে ভাবার উপলক্ষ। আর যে জীবাণু একসময় মৃত্যুর আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত ছিল, আজ তারই সঙ্গে ল্যাবে থাকা—এই বৈপরীত্য তাঁর জীবনের দুই ভিন্ন অধ্যায়কে পাশাপাশি এনে দিয়েছে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:১৪ পূর্বাহ্ণ