কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: কাজের সহজলভ্যতা নাকি বাড়তি চাপ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:৪০ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর পদচারণা এখন এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব উন্নতি আমাদের দৈনন্দিন কাজের ধারা বদলে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সুফল নিয়ে রয়েছে নানা মতভেদ। প্রযুক্তির সমর্থকরা বলছেন, এআই মানুষের কাজের চাপ কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে অনেক কর্মীই পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন, প্রযুক্তি যদি কম সময়ে কাজ গুছিয়ে আনার পথ তৈরি করে দেয়, তবে মানুষের অবসর সময় বাড়ছে না কেন? বরং দেখা যাচ্ছে, কাজের পরিমাণ এবং প্রত্যাশা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি এখন বড় এক ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পেশাজীবীদের জন্য।

প্রযুক্তির এই বিবর্তনের ধারায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রায়হানের মতো অনেক কর্মীর ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা নিয়েও তারা ব্যক্তিগত সময় বের করতে হিমশিম খাচ্ছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে জটিল অনেক কাজ সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এর ফলে কর্মক্ষেত্রে একই সময়ে আরও বেশি কাজ সম্পন্ন করার চাপ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি মানুষের দক্ষতা বাড়াচ্ছে কিন্তু সেই দক্ষতা এখন অনেকটা বাধ্যবাধকতা হিসেবে কর্মীর ওপর চেপে বসছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ কেবল যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কি না, বা যন্ত্রের গতিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে গিয়ে নিজের মানসিক প্রশান্তি হারাচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।

সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তার মতে, এআই মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়নি, বরং এটি উৎপাদনের গতি ও মান উন্নয়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। প্রযুক্তির এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন ভিন্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমাজবিজ্ঞানী ও কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞরা। মূলত প্রযুক্তি যখন কোনো প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি সুবিধা দেয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কর্মীর ওপর কাজের প্রত্যাশাও বেড়ে যায়। এখানেই মূল সমস্যাটি তৈরি হয়। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং মানবশ্রমের ভারসাম্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

কর্মক্ষেত্রে এআই-এর ভূমিকা নিয়ে এই বিতর্ক নতুন নয়। অটোমেশনের সুবিধা কি সরাসরি কর্মীরা পাচ্ছেন, নাকি তা কেবল প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এআই ব্যবহারের কারণে কর্মীরা অনেক ছোট ছোট কাজ থেকে মুক্তি পেলেও, তাদের ওপর এমন নতুন সব জটিল কাজ দেওয়া হচ্ছে যা মোকাবিলা করা আগের চেয়েও চ্যালেঞ্জিং। কাজের সহজলভ্যতা যে সময় বাঁচিয়ে দিতে পারতো, তা এখন নতুন সব প্রজেক্টের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে দিনশেষে কর্মীরা প্রযুক্তি ব্যবহারের পরেও ক্লান্ত এবং চাপের মুখে থাকছেন।

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই প্রযুক্তির ব্যবহার যেন মানুষের সৃজনশীলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব না ফেলে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। প্রযুক্তি যেন কাজের চাপ বৃদ্ধির পরিবর্তে মানুষের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটায়, সেই লক্ষ্যেই নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। নতুবা যন্ত্রের সাথে প্রতিযোগিতায় মানুষ কেবল পিছিয়ে পড়বে না, বরং কাজের প্রকৃত আনন্দ ও ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলবে।

পরিশেষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল কাজের হাতিয়ার নয়, এটি আমাদের কাজের সংস্কৃতিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাচ্ছে। এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের পরামর্শের আলোকে যদি আমরা এআই-কে কেবল উৎপাদন বাড়ানোর পরিপূরক শক্তি হিসেবে দেখি, তবেই এর সুফল পাওয়া সম্ভব। অন্যথায়, প্রযুক্তির এই অভিশাপ থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কর্মীরা যদি প্রযুক্তির সুবিধাগুলো নিজেদের আয়ত্তে রেখে কাজের সময় ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, কেবল তখনই বলা যাবে এআই সত্যিই মানুষের জীবনের জন্য সহায়ক হয়েছে। নতুবা, প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করার পরিবর্তে এক অদৃশ্য জটিল বেড়াজালের দিকে ঠেলে দেবে, যা কাম্য হতে পারে না।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন