টঙ্গীতে শিশু নিপীড়নের অভিযোগ: বিচারের নামে আইন হাতে তুলে নেওয়া কাম্য নয়

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ । ২:১৫ অপরাহ্ণ

সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় এক মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ ওঠার পর ওই শিক্ষককে স্থানীয় জনতার হাতে মারধরের শিকার হতে হয় এবং সেই ঘটনার ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনাটি আমাদের সমাজে শিশু সুরক্ষা, শিক্ষকের নৈতিকতা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বিষয়গুলোকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখন একজন শিক্ষক তার ছাত্র বা ছাত্রীর বিরুদ্ধে অমানবিক কোনো কাজ করেন, তখন তা সমাজকে গভীরভাবে কলঙ্কিত করে। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু যখন সেই রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে। টঙ্গীর এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় মানুষের যে ক্ষোভ, তা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের অপরাধবোধ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই উত্তেজিত জনতার দ্বারা অভিযুক্তকে মারধর করা আইনের শাসনের পরিপন্থী। গণপিটুনি বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় অনুভূতির আড়ালে বা আইনি জটিলতার অজুহাতে অপরাধ আড়াল করার সুযোগ কোনোভাবেই থাকা উচিত নয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং আইনের। মাদ্রাসাশিক্ষক হোক বা যেকোনো পেশার মানুষ, নৈতিক অবক্ষয় রোধে এবং অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে পক্ষপাতহীন তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। যদি কোনো শিক্ষক নৈতিক স্খলনে জড়ান, তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। মানুষ যখন মনে করে যে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় বিলম্ব হবে বা অপরাধী পার পেয়ে যাবে, তখন তারা সামাজিকভাবেই বিচার করার চেষ্টা করে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য ক্ষতিকর। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।

শিশু নিগ্রহের মতো ঘটনাগুলো আমাদের সমাজ ও পারিবারিক কাঠামোর দুর্বলতাকে উন্মোচিত করে। অভিভাবকদের সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মনিটরিং এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগই পারে শিশুদের একটি নিরাপদ পরিবেশ দিতে। ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে কেউ যেন সুরক্ষা না পায় এবং আইনের অপব্যবহার যেন না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের প্রত্যাশা, গাজীপুরের এই ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিশুকেই এমন পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন