ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন কার্যক্রম: কতটা সফল হবে উদ্যোগ?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ । ৮:১৪ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের চর্চিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোকে এবার আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন থেকে এই যানগুলোর নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সড়কে চলাচলকারী অযান্ত্রিক ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ, অনিবন্ধিত যানের দৌরাত্ম্য বন্ধ, জোনভিত্তিক চলাচল নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত নকশায় যানবাহন তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে শুধু নিবন্ধন ও কাগজে-কলমে নিয়মের বেড়াজাল দিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে মোট আটটি জোনে ভাগ করে আলাদা রঙের অটোরিকশা চলাচলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিটি এলাকার জন্য নির্দিষ্ট যান বরাদ্দ থাকবে, যা এলোমেলো চলাচলের প্রবণতা কমাতে পারে বলে কর্তৃপক্ষের ধারণা। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ক্ষেত্রে নিবন্ধনের জন্য ফরম বিক্রি শুরু হয়েছে এবং প্রতিটি অটোরিকশা নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যান্ত্রিক নকশা ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতেই এই কারিগরি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে পরিবহন বিশ্লেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, সমস্যার মূল জায়গা কেবল নিবন্ধন নয়। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ বা শৃঙ্খলায় ফেরানোর বিষয়টি কেবল ফরম পূরণ বা বুয়েটের ছাড়পত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে তা ব্যর্থ হতে পারে। এর পেছনে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, এসব রিকশার চালকদের প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা বা বৈধ লাইসেন্স নেই। চালকের দক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে কেবল যানের নিবন্ধন দিয়ে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, মালিকানার বিষয়টিও বেশ অস্পষ্ট। অধিকাংশ অটোরিকশা ছোট ছোট মালিক বা প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা কঠিন।

নগর পরিকল্পনার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে এসব ছোট ছোট উদ্যোগ প্রায়ই মুখ থুবড়ে পড়ে। অতীতেও নানা সময়ে অটোরিকশা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনোটিই কার্যকর হয়নি। এবার নিবন্ধনের মাধ্যমে জোনভিত্তিক চলাচলের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা কতটা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, তা দেখার অপেক্ষায় নগরবাসী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে অবৈধ ও নকশাবহির্ভূত অটোরিকশা শনাক্ত করা সহজ হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, হাজার হাজার অটোরিকশা কি সত্যিই এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আসতে আগ্রহী হবে? নাকি নিবন্ধন না থাকা বা নামমাত্র নিবন্ধন নিয়ে আগের মতোই সড়ক দখল করে রাখবে তারা?

পরিশেষে, নিবন্ধন কোনো যাদুর কাঠি নয়, বরং এটি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। আসল নিয়ন্ত্রণ আসবে যদি কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ চালক নিয়োগ এবং অটোরিকশার নির্দিষ্ট করিডোর বা পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। যাত্রীসেবা ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করে একটি সমন্বিত পরিবহন নীতিমালা প্রণয়ন না করলে এই নিবন্ধন কার্যক্রম কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়াবে, কিন্তু সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন