বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির যে প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক কঠিন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনযাপন এখন চরম হুমকির মুখে। মাসের পর মাস কঠোর পরিশ্রম করেও তাদের উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসারের নূন্যতম চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার বাসিন্দা পোশাকশ্রমিক রাজিব আহসানের যাপিত জীবনের চিত্রটি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতারই একটি প্রতিচ্ছবি। গত দুই মাস ধরে তার পাতে মাছ ওঠেনি। মাংসের স্বাদ নেওয়া তো আরও দূরের বিষয়, যা কেবল দুই ঈদের উৎসবের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ। রাজিবের মতো হাজারো শ্রমিকের কাছে এখন পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবারের চেয়ে কোনোমতে পেট বাঁচানোর সংগ্রামটিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বেতনের টাকা দিয়ে মাসের শুরুতে কেবল বেঁচে থাকার নূন্যতম রসদ জোগাড় করতে গিয়েই তাদের নাভিশ্বাস উঠছে।
একই পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন আরেক পোশাকশ্রমিক জামেলা খাতুন। তার সংসারে অভাবের কালো ছায়া আরও দীর্ঘ। গত দুই বছরে তার বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে নামমাত্র দেড় হাজার টাকা। অথচ মুদ্রাস্ফীতির দৌরাত্ম্যে এই একই সময়ে তার পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বেড়েছে সাত থেকে আট হাজার টাকা। অসুস্থ স্বামীর কর্মহীনতা এবং সংসারের পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে থাকা জামেলার জন্য এখন প্রতিটি দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়। তার আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই বড় ব্যবধান তাকে বাধ্য করছে জীবনের মৌলিক অনেক চাহিদা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে।
এই মূল্যস্ফীতির সরাসরি ও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় পর্যায়ের খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে কেনাকাটার প্রবণতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ক্রেতারা এখন বিলাসবহুল বা শখের কোনো পণ্য কেনা তো দূরে থাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও হিসেব কষছেন। অনেক দোকানে ক্রেতাদের ভিড় কমে গেছে এবং দোকানদারদের পণ্য বিক্রি করার হার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। স্থানীয় খুচরা দোকানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতারা এখন শুধুমাত্র চাল, ডাল বা তেলের মতো একান্ত প্রয়োজনীয় পণ্যের দিকেই মনোযোগী।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের উপার্জনের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির এই ধারা চলতে থাকলে সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। পোশাক শ্রমিকদের মতো যারা নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ থাকলেও দামের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই অচলাবস্থা কাটানো না গেলে একদিকে যেমন মানুষ পুষ্টিহীনতায় পড়বে, অন্যদিকে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, মুদ্রাস্ফীতির এই চাকা সচল থাকলে সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। এই অর্থনৈতিক সংকট কেবল ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দেশের সামগ্রিক খুচরা বাণিজ্যের কাঠামোকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই অসামঞ্জস্য দূর করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের এই নীরব হাহাকার দেশের অর্থনীতির ওপর আরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ । ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ