গ্রামবাংলার আবহমান সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ লাঠিখেলা। কালের বিবর্তনে এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটি যখন হারিয়ে যেতে বসেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যুক্ত করলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। শুক্রবার বিকেলে মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার ডুমুরশিয়া ডিসি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী ১০৬তম লাঠিখেলা প্রতিযোগিতা। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মন্ত্রী কেবল ফিতা কেটে বা প্রদীপ জ্বালিয়ে আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেননি, বরং নিজে লাঠি হাতে মাঠে নেমে উদ্বোধনী খেলায় অংশ নিয়ে উপস্থিত দর্শকদের চমকে দিয়েছেন।
বিকেলের স্নিগ্ধ রোদ আর গ্রামীণ মেঠো পথের ধুলো উড়িয়ে যখন লাঠিয়ালরা বাদ্যের তালে তালে তাদের বীরত্বপূর্ণ ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন করছিল, তখন পুরো মাঠ জুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল এক উৎসবের আমেজ। ঢাকের আওয়াজ আর লাঠির ঠকঠক শব্দের মধ্যে মন্ত্রীকে অংশগ্রহণ করতে দেখে স্থানীয় হাজারো মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়েন। এই দৃশ্য যেন গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালী অতীতের স্মৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে তুলল। দীর্ঘ দিনের চর্চা আর ভালোবাসার ফসল হিসেবে ডুমুরশিয়া গ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনটি এবার ১০৬তম বছরে পদার্পণ করেছে, যা স্থানীয়দের কাছে এক গর্বের বিষয়।
মেলার মাঠে আয়োজিত বিচার গান ও লাঠিখেলা উপলক্ষ্যে আয়োজিত জনসভায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, আবহমান বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই লাঠিখেলা। এটি কেবল একটি শারীরিক কসরত নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির শক্তি ও সাহসের প্রতীক। আধুনিকতার ভিড়ে আমরা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলছি, কিন্তু গ্রামের এই ঐতিহ্যগুলো আমাদের শেকড়ের পরিচয় দেয়। এই খেলা ধরে রাখা মানেই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা। মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে সমবেত জনতা করতালি দিয়ে সমর্থন জানান।
অনুষ্ঠানস্থলটি পরিণত হয়েছিল এক মিলনমেলায়। লাঠিখেলাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের মাঠজুড়ে বসেছিল গ্রামীণ মেলার আমেজ। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় বিচার গানের আসর ছিল বাড়তি আকর্ষণ। আশেপাশে বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা মানুষের ঢল আর উৎসবমুখর পরিবেশ প্রমাণ করেছে, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এখনো মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার গ্রামীণ ও লোকজ সংস্কৃতি চর্চার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা সম্ভব হবে।
উপস্থিত স্থানীয় প্রবীণরা জানান, ১০৬ বছর ধরে এই মাঠে লাঠিখেলার আয়োজন হয়ে আসছে। সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছু বদলে গেলেও লাঠিখেলার এই রীতি তারা ধরে রেখেছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রীর এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পৃষ্ঠপোষকতার আশ্বাস স্থানীয় আয়োজকদের দীর্ঘদিনের এই প্রচেষ্টাকে আরও উৎসাহিত করবে। পরিশেষে, গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়। এই লাঠিখেলা কেবল বিনোদন নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার ক্ষেত্রেও এক অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে বলে আয়োজকরা মনে করেন।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬ । ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ