কেনিয়ার পূর্বাঞ্চলের শাকাহোলা বনাঞ্চলে সংঘটিত এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত স্বঘোষিত ধর্মগুরু পল ম্যাকেঞ্জিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর মোম্বাসা হাইকোর্ট এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ভয়ংকর এই অপরাধের ঘটনায় শুধুমাত্র ম্যাকেঞ্জিই নন, তার সঙ্গে জড়িত আরও দুই ডজনেরও বেশি সহযোগীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মূলত ধর্ম ও পরকালের নামে সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল।
তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, পল ম্যাকেঞ্জি গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল চার্চ নামক একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তার অনুসারীদের এই মর্মে প্ররোচিত করেছিলেন যে, পৃথিবী ধ্বংসের পথে এবং স্বর্গে স্থান পেতে হলে তাদের জাগতিক জীবনের সব মায়া ত্যাগ করে শাকাহোলা বনের নির্জনতায় আশ্রয় নিতে হবে। ধর্মগুরুর এই বিভ্রান্তিকর উপদেশের ফাঁদে পড়ে শত শত মানুষ নিজেদের সহায়-সম্পত্তি ও বাড়িঘর বিক্রি করে বনের ভেতরে আস্তানা গেড়েছিল। বনের ভেতর অনুসারীদের উপোস করে থাকতে বাধ্য করা হতো, যাতে তারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় অকালে মৃত্যুবরণ করে স্বর্গের পথে পাড়ি দিতে পারে। এই অমানবিক প্রক্রিয়ায় মোট ১৯১ জনের প্রাণহানি ঘটে, যার মধ্যে ১৯০ জনই ছিল কোমলমতি শিশু।
দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই মামলার শুনানিতে সরকারি কৌঁসুলি ও তদন্ত কর্মকর্তারা ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। শাকাহোলা বন থেকে যখন একের পর এক গণকবর উদ্ধার করা হচ্ছিল, তখন পুরো কেনিয়াজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয় প্রশাসন জানায়, ধর্মগুরুর নির্দেশ অমান্য করার কোনো সুযোগ ছিল না। যারা অনাহারে থাকতে আপত্তি জানাত, তাদের ওপর চালানো হতো শারীরিক নির্যাতন। মূলত ম্যাকেঞ্জির তৈরি করা সেই বদ্ধমূল ধারণা যে অনাহারই মুক্তি বা স্বর্গের চাবিকাঠি, তা বহু পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আদালত রায় প্রদানের সময় তার এই কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী ও নিষ্ঠুর অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পল ম্যাকেঞ্জির এই সাজা কেনিয়ার বিচার ব্যবস্থায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। কারণ, ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে কীভাবে অপরাধ জগত তৈরি করা যায়, এই ঘটনাটি তার জঘন্যতম দৃষ্টান্ত। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা না দেখালেও আদালতের রায় আজ অনেক ভুক্তভোগী পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দিয়েছে। কেনিয়ার সাধারণ মানুষ আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই রায়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ধর্মের নামে এ ধরনের সহিংসতা ও জালিয়াতি বন্ধ হবে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অপরাধীরা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে। আপাতত ম্যাকেঞ্জি ও তার সঙ্গীরা দীর্ঘ মেয়াদী কারাবাসের জন্য কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটাচ্ছেন, যা তাদের অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি হিসেবেই দেখছে সচেতন মহল।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬ । ১১:১৪ অপরাহ্ণ