ঢাকার সড়কে নৈরাজ্যের ডিজিটাল রূপক ‘বাপের রাস্তা’

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬ । ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ

ঢাকার রাস্তাঘাটে যানজট আর বিশৃঙ্খলা যেন নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ট্রাফিক আইন অমান্য করে উল্টো পথে গাড়ি চালানো, ব্যস্ত রাস্তায় নিয়ম ভেঙে গতির প্রতিযোগিতা কিংবা যত্রতত্র হর্ন বাজিয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ করা—এ সবই আমাদের প্রতিদিনের যাতায়াতের সঙ্গী। এই নির্মম বাস্তব চিত্রটিই এবার উঠে এসেছে ডিজিটাল মাধ্যমে। ‘বাপের রাস্তা’ নামে একটি অনলাইন সিমুলেশন বা গেম সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে, যা ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনার বেহাল দশা ও চালকদের বেপরোয়া মনোভাবকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরছে।

এই ডিজিটাল আয়োজনে একজন চালককে দেখা যায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ব্যস্ত সড়কের মাঝ দিয়ে উল্টো পথে দ্রুতগতিতে ছুটে চলতে। তার এই আচরণ যেন সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির এক চরম উদাহরণ। সামনে পথচারীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সরে দাঁড়াচ্ছেন, দুপাশে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির ভিড়, কিন্তু তার তোয়াক্কা নেই। চালক ক্রমাগত উচ্চশব্দে হর্ন বাজিয়ে নিজের দাপট বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে যখনই কোনো গাড়ির সঙ্গে তার অটোরিকশার সংঘর্ষ ঘটে, তখনই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে জাতীয় ক্ষতির একটি স্কোর। এটি মূলত আমাদের সড়ক অব্যবস্থাপনার ফলে যে প্রতিদিন বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সময়গত ক্ষতি হচ্ছে, তারই একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতিফলন।

সড়কের ওপর এই ধরণের দাপটকে এ দেশের মানুষ প্রায়ই ‘বাপের রাস্তা’ বলে তাচ্ছিল্য করে থাকে। নামটি যেমন ইঙ্গিতপূর্ণ, গেমটির বিষয়বস্তুও ঠিক তেমনি ধারালো। গেমের একটি পর্যায়ে দেখা যায়, চালকের এই বেপরোয়া আচরণের কারণে স্থানীয় জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা চালককে ধাওয়া করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে গণপিটুনি দেয়। ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই চিত্রটি বাস্তবের অনেকটা কাছাকাছি। ঢাকার সড়কে যখন কেউ আইন অমান্য করে অন্যের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় জনরোষ থেকে চালককে রেহাই পেতে হয় না। এই ঘটনাটি মূলত আমাদের সামাজিক অস্থিরতা এবং আইনের শাসনের অভাবকে ফুটিয়ে তোলে।

প্রযুক্তির এই বিবর্তনে ভিডিও গেম বা সিমুলেশন এখন কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সমালোচনার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। ‘বাপের রাস্তা’ গেমটি ঢাকার সড়কের বাস্তব অবস্থাকে অত্যন্ত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে। এখানে চালকের যে মনস্তত্ত্ব দেখানো হয়েছে, তা মূলত সড়কে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করার এক অদ্ভুত মানসিকতা থেকে উদ্ভূত। এই সিমুলেশনের প্রতিটি পর্যায় বুঝিয়ে দেয়, কীভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন চালনা কেবল ওই ব্যক্তি বা যানের ক্ষতি করছে না, বরং তা পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাকেই একটি স্থবির ও বিপজ্জনক অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরণের ডিজিটাল উপস্থাপন সমাজের মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির একটি নতুন মাধ্যম হতে পারে। যখন একজন সাধারণ ব্যবহারকারী নিজের হাতে স্টিয়ারিং ধরে ভার্চুয়াল রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন এবং তার ফলে সৃষ্ট ‘জাতীয় ক্ষতি’ দেখতে পাবেন, তখন হয়তো বাস্তবের রাস্তাঘাটেও তাদের সচেতনতা কিছুটা হলেও বাড়বে। তবে মূল সমস্যাটি কেবল গেমের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার সড়কের যে বিশৃঙ্খলা, তা নিরসনে প্রয়োজন কঠোর ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষার উন্নয়ন। যতদিন পর্যন্ত সড়কে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত না হবে, ততদিন ‘বাপের রাস্তা’র মতো ভার্চুয়াল চিত্রগুলো কেবল বাস্তবতার করুণ সাক্ষী হয়েই থাকবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই ধরণের আয়োজনের মাধ্যমে ঢাকার সড়কের যে বেপরোয়া সংস্কৃতির সমালোচনা উঠে এসেছে, তা আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন