নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন ছিল এক অন্যরকম স্বর্ণসময়। সেই সময়ে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন মৌসুমী এবং শাবনূর। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে প্রায় কাছাকাছি সময়ে চলচ্চিত্রে পা রাখা এই দুই অভিনেত্রী নিজ নিজ অভিনয়শৈলী দিয়ে জয় করে নিয়েছিলেন অগুনতি মানুষের মন। তাদের ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মধ্যে এক ধরণের কৌতূহল কাজ করত, আর তা হলো—তারা কি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি কেবল সহকর্মী। যদিও পর্দার আড়ালে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ, কিন্তু গণমাধ্যম এবং দর্শকের চোখে তারা ছিলেন একে অপরের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
সেই সময় ঢাকাই সিনেমার বাণিজ্যিক ধারা ছিল প্রচণ্ড রকমের শক্তিশালী। মৌসুমী যেমন দর্শকদের কাছে তার রূপ ও আবেদনের মাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা পান, শাবনূরও ঠিক তেমনই নিজের সহজাত অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। সিনেমার বাজারের এই দুই প্রধান স্তম্ভকে নিয়ে প্রযোজক ও পরিচালকরাও বেশ সতর্ক থাকতেন। দর্শক মনে করতেন, এই দুই তারকা হয়তো সবসময় একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিলেন। তবে বিষয়টি যতটা না ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল পেশাদার প্রতিযোগিতার অংশ। তারকা হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য তারা দুজনই ছিলেন আপসহীন।
এককভাবে এই দুই তারকা অসংখ্য সুপারহিট ছবিতে অভিনয় করেছেন। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ যাত্রায় তারা দুজনেই ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখেছেন। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, এত বড় দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাদের দুজনকে একসঙ্গে খুব বেশি সিনেমায় দেখা যায়নি। অনেক দর্শকই জানতে চান, আসলে কয়টি সিনেমায় তারা একসঙ্গে কাজ করেছেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে খুব সহজেই বোঝা যায় যে, বাণিজ্যিক সিনেমার তৎকালীন কাঠামোর কারণে অনেক সময় শীর্ষ দুই অভিনেত্রীকে একই ফ্রেমে আনাটা বেশ কঠিন ছিল। পারিশ্রমিক, চরিত্র নির্বাচন এবং পর্দার সময়ের ভারসাম্য বজায় রাখার মতো জটিল সমীকরণের কারণে এমনটি ঘটেছিল।
মৌসুমী ও শাবনূরকে প্রথমবারের মতো একই সিনেমায় বড় পর্দায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব দেওয়া হয় ঢালিউডের প্রয়াত জনপ্রিয় নায়ক মান্নাকে। সেই সময়ে মান্নার প্রযোজনা কিংবা পরিচালনায় এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যেখানে এই দুই তারকাকে একই ফ্রেমে দেখা যায়। তবে সেই সংখ্যাটি যে হাতে গোনা, তা বলাই বাহুল্য। তাদের একসঙ্গে কাজ করার বিষয়টি সেই সময়ে ভক্তদের কাছে ছিল এক বিশাল চমক। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সেটি ছিল একটি বিরল মুহূর্ত।
বর্তমানে যখন আমরা নব্বইয়ের দশকের সেই সিনেমার কথা চিন্তা করি, তখন মৌসুমী ও শাবনূরকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তারা ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। তাদের সুস্থ প্রতিযোগিতা ঢাকাই সিনেমার মানোন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছিল। যখনই তারা পর্দায় আলাদাভাবে উপস্থিত হয়েছেন, দর্শক তাদের দুই ধরণের মুগ্ধতায় ডুবেছে। আর যখনই তারা একসঙ্গে পর্দায় এসেছেন, সেই মুহূর্তগুলো চলচ্চিত্র ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থেকেছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মৌসুমী ও শাবনূরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার চেয়ে বরং ঢাকাই সিনেমার দুই সফল পথপ্রদর্শক হিসেবে মূল্যায়ন করাই বেশি যুক্তিযুক্ত। তাদের এই কাজগুলো আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি শিক্ষা হিসেবে রয়ে গেছে, কীভাবে নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা যায়।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬ । ৮:১৪ পূর্বাহ্ণ