জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের শিশুশিক্ষার ভবিষ্যৎ এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোর শিশুরা প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গত এক বছরে বিদ্যালয়গামী শিশুদের প্রায় ৪৯ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকিগ্রস্ত এলাকার শিশুরা নিয়মিত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গত দুই বছরে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ৯৬ শতাংশ শিশু অন্তত একবার কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় কিংবা নদীভাঙনের মতো ঘটনার পর তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির ওপর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুর্যোগের সময় বিদ্যালয়গুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় নিয়মিত পাঠদান বন্ধ হয়ে যায় অথবা যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে পৌঁছাতে পারে না।
কেবল শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, দুর্যোগের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। তীব্র তাপপ্রবাহ কিংবা দুর্যোগের পরবর্তী সময়ে এসব এলাকার ৮০ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছে। অপুষ্টি, পানিবাহিত রোগ ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি তাদের পড়াশোনায় মনোযোগী হতে বাধা দিচ্ছে। বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার কমে যাওয়ার পেছনে এই স্বাস্থ্য সংকটও অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তন শিশুদের শৈশবকে অনিরাপদ করে তুলছে। বিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুতি না থাকা এবং দুর্যোগের পরবর্তী সময়ে শিক্ষাকার্যক্রম পুনরুদ্ধারের ধীরগতি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হারকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদি জরুরিভিত্তিতে এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে আগামী প্রজন্মের বড় একটি অংশ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল ত্রাণ সহায়তা বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর না করে, শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্যোগসহনশীল করে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। দুর্যোগের সময় বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখা, বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক ও শারীরিক সেবা প্রদানের বিষয়টি জোরদার করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া শিশুদের শিক্ষাজীবনকে স্বাভাবিক রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬ । ১:১৬ পূর্বাহ্ণ