আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে সন্তান বড় হওয়ার সাথে সাথে অনেক অভিভাবকই একটি সূক্ষ্ম অথচ গভীর শূন্যতা অনুভব করেন। ঠিক যেমনটি ঘটেছে তাহেরা বেগমের ক্ষেত্রে। তার তেরো বছর বয়সী মেয়ে অরু এখন পড়ার টেবিলে বই খুলে রাখলেও তার সমস্ত মনোযোগ আটকে থাকে মুঠোফোনের স্ক্রিনে। কয়েক দিন ধরে মেয়েটির আচরণের এই পরিবর্তন মা হিসেবে তাকে বেশ চিন্তিত করে তুলেছে। অরু এখন স্কুল থেকে ফিরে খুব কম কথা বলে, সারাদিনের অভিজ্ঞতার গল্পগুলো যেন হারিয়ে গেছে কোথাও। কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলে সে এখন আর প্রাণ খুলে উত্তর দেয় না, বরং খুব সংক্ষিপ্ত ও যান্ত্রিক জবাবে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এমন চিত্র আজ অনেকের ঘরেই নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে কৈশোরের একটি সাধারণ পর্যায় হিসেবে দেখলেও অভিভাবকরা একে বিচ্ছিন্নতা হিসেবে দেখেন। শৈশবে যেসব শিশু বাবা-মায়ের ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকত, তারাই কৈশোরে পা দিয়ে নিজের জগৎ তৈরি করতে চায়। এই বয়সে তাদের মনে এক ধরনের নতুন সত্তার জন্ম নেয়, যেখানে বন্ধুদের গুরুত্ব বাড়ে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার প্রবণতা প্রকট হয়ে ওঠে। মা-বাবারা যখন দেখেন তাদের প্রাণবন্ত সন্তানটি হঠাৎ করেই নিজেকে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে গুটিয়ে নিচ্ছে, তখন তারা আতঙ্কে ভোগেন। এই অকারণ নীরবতা কি বড় হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি পরিবারের সাথে তাদের মানসিক দূরত্ব বাড়ছে, সেই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এই দূরত্বের কারণগুলোকে আরও ঘনীভূত করেছে। আগে সন্তানরা অবসরে বাবা-মায়ের সাথে সময় কাটাত, এখন সেই সময়টুকু তারা ভার্চুয়াল জগতে ব্যয় করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গেম কিংবা ইন্টারনেটের অসীম দুনিয়া তাদের মনস্তাত্ত্বিক জগতের অনেকটা দখল করে নিয়েছে। ফলে বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়ে তারা ডিজিটাল সম্পর্কের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। বাবা-মায়েরা যখন তাদের সাথে আলাপ করতে চান, তখন তারা এটিকে হস্তক্ষেপ মনে করে বিরক্ত হয়। এই দুই প্রজন্মের চিন্তাধারার ফারাক পারিবারিক বন্ধনগুলোকে আরও ঠুনকো করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞগণ পরামর্শ দেন যে, এই সংকটের মুহূর্তে কঠোর শাসনের চেয়ে ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া বেশি জরুরি। জোর করে তাদের জগত থেকে টেনে বের না করে বরং তাদের জগতটা বোঝার চেষ্টা করা দরকার। অরু যেমন তার মায়ের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে, তেমনি অনেক কিশোর-কিশোরীই মনে করে অভিভাবকরা তাদের আবেগ বুঝতে অক্ষম। তাই সন্তানদের সাথে সম্পর্কের ভিত মজবুত করতে হলে আলাপচারিতার ধরন বদলাতে হবে। তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। সন্তানদের কথা শোনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা না গেলে এই দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।
পরিশেষে, সন্তান বড় হওয়ার মানে এই নয় যে তারা আমাদের থেকে চিরতরে দূরে সরে যাচ্ছে। এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক পরিবর্তনের ধাপ। অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, তাদের এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং তাদের পাশে থাকা। প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের সাথে গুণগত সময় কাটানো, যেখানে ফোনের কোনো জায়গা থাকবে না। ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমেই এই মানসিক দূরত্ব ঘুচিয়ে আবার তাদের কাছাকাছি আসা সম্ভব। অরু বা তাহেরা বেগমের গল্পটি হয়তো প্রতিটি বাড়িরই চিত্র, তবে সঠিক বোঝাপড়া ও সহমর্মিতা দিয়ে এই জটিলতাকে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ । ১:১৪ অপরাহ্ণ