প্রথাগত কোনো নিয়োগপত্র নেই, নেই সরকারি কোনো বেতন কিংবা নিয়মিত কাজের নিশ্চয়তা। তবুও সমাজের দায়বদ্ধতা থেকে গত পাঁচটি বছর ধরে এক ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিং পাহারা দিয়ে আসছেন ঠাকুরগাঁওয়ের এক সাধারণ ভ্যানচালক নুর ইসলাম। কোনো কর্তৃপক্ষের আদেশে নয়, বরং এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে নিজ উদ্যোগে তিনি পালন করে আসছেন এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তার এই নিঃস্বার্থ কাজের ফলে ওই এলাকায় ছোটখাটো থেকে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে।
ঘটনার শুরুটা হয়েছিল প্রায় পাঁচ বছর আগে। সে সময় ওই রেলক্রসিংয়ে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় দুজন পথচারীর প্রাণহানি ঘটে। চোখের সামনে মানুষের এমন করুণ মৃত্যু নুর ইসলামকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। মূলত সেই দিন থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এই ক্রসিংয়ে যেন আর কোনো প্রাণ না ঝরে। ভ্যান চালিয়ে সংসার চালানো নুর ইসলাম নিজের কাজের ফাঁকে সময় বের করে নেন রেলক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে সংকেত দেওয়ার জন্য। যখনই ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়, তিনি লাল পতাকা হাতে নিয়ে ছুটে যান ক্রসিংয়ের দিকে। থামিয়ে দেন পথচারী ও যানবাহনকে। তার এই উপস্থিত বুদ্ধি এবং সতর্কবাণী স্থানীয়দের কাছে তাকে এক আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নুর ইসলাম যেভাবে প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দায়িত্ব পালন করেন, তা সত্যিই বিরল। বিশেষ করে যেসব ক্রসিংয়ে কোনো স্থায়ী গেইটম্যান বা সতর্কবার্তা নেই, সেখানে নুর ইসলামের মতো একজন সচেতন মানুষের উপস্থিতি অনেক বড় আশীর্বাদ। যদিও তার এই কাজের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই, তবু তিনি থেমে নেই। প্রতিদিনের জীবিকার তাগিদে ভ্যান চালানো আর জীবন রক্ষায় রেলক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা—দুটো কাজই তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এই নীরব সেবা অনেকেরই জীবন রক্ষা করছে, যা স্থানীয় জনসাধারণের প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নুর ইসলামের মতো সাধারণ মানুষের এই উদ্যোগ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, অনেক সময় বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়েও ব্যক্তিগত সচেতনতা ও মানবিকতা অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। রেলওয়ের নীতিনির্ধারকদের উচিত এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা এবং নুর ইসলামের মতো যারা মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় এগিয়ে আসছেন, তাদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন করা। সরকারিভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না হওয়া পর্যন্ত নুর ইসলামের এই স্বেচ্ছাশ্রম স্থানীয়দের জন্য বড় ভরসার জায়গা হয়ে থাকবে। তবে নুর ইসলামের দীর্ঘমেয়াদী এই প্রচেষ্টার প্রতি সাধারণ মানুষের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, কোনো পদবি বা বেতন নয়, মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনো অর্জন নেই।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ । ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ