গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও বিরোধী রাজনীতির সংকট

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ । ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের স্বরূপ এবং বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে যে অস্পষ্টতা ও সংকট দৃশ্যমান, তা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। গণতন্ত্র কেবল পাঁচ বছর পর পর একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই পূর্ণতা পায় না, বরং এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত থাকা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনালগ্নে নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর অভাব আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। গণতন্ত্রের মূল নির্যাস হলো জনগণের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হওয়া। কিন্তু যখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট দলের হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তখন তা সহজেই স্বৈরতান্ত্রিক রূপ ধারণ করতে পারে, যা রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের স্বার্থকে প্রান্তিক করে তোলে।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের ধারণাটি অনেক ক্ষেত্রেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচনের দিনটিকেই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়। এই ন্যূনতম সংজ্ঞার ফাঁদে পড়ে আমরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রায়শই উদাসীন থাকি। যখন একটি রাষ্ট্রে নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়গুলোতে বিরোধী দলগুলো কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না, তখন ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিরোধী দলের দায়িত্ব কেবল নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নয়, বরং নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলার পরিবর্তে কেবল নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকা একটি গোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে। এতে জনগণের প্রকৃত উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটা কঠিন হয়ে পড়ে।

গণতন্ত্রকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, এখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষেরই সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতায় পরিবর্তন আসা জরুরি। যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে এবং বিরোধী দলের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে দমন করা হয়, তবে গণতন্ত্র কেবল কাগজে-কলমে টিকে থাকে। জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন যে পরিবর্তনের আন্দোলন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তাও মূলত একটি সুস্থ ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। তরুণ প্রজন্মের এই উত্থান বুঝিয়ে দেয় যে, চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কার ও বিরোধী রাজনীতির নতুন সংজ্ঞায়নের প্রয়োজনীয়তা এখন অপরিহার্য।

পরিশেষে, বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বিরোধী দলগুলোর গঠনমূলক কর্মকাণ্ড। যতক্ষণ না আমরা রাষ্ট্রকে এমন একটি কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে পারছি, যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তি নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করবে এবং জনগণের স্বার্থ প্রাধান্য পাবে, ততক্ষণ গণতান্ত্রিক সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না। বিরোধী রাজনীতির ব্যর্থতা বা অকার্যকর ভূমিকার কারণে তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের আদর্শিক অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে হবে এবং জনগণের সাথে গভীর সংযোগ স্থাপন করতে হবে। আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে হলে সংকুচিত গণতন্ত্রের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে একটি অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন