আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা এবং তার বিপরীতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে যখন জ্বালানির দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসছে, ঠিক তখনই দেশের বাজারে এই পণ্যের দাম কেন বাড়ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন উদ্বেগ রয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চলছে নানা বিশ্লেষণ। তেলের দাম নির্ধারণের এই জটিল সমীকরণ কেবল একটি একক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং এর পেছনে রয়েছে মুদ্রার বিনিময় হার, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ও নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতার মতো বহুমাত্রিক চাপ।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমার খবরটি যতটা ইতিবাচক মনে হয়, বাস্তবতা ততটা সরল নয়। প্রথমত, বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম কমলেও, আমদানিকৃত জ্বালানির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মানের ওপর। গত কয়েক বছরে ডলারের তীব্র সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়ন দেশের জ্বালানি আমদানিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য কমলেও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে সরকারকে প্রায় একই খরচে জ্বালানি ক্রয় করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার, যা শেষ পর্যন্ত জ্বালানির খুচরা মূল্য সমন্বয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে আমদানিনির্ভরতার বিষয়টি। দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ হয় আমদানি করা জ্বালানি দিয়ে। লজিস্টিক খরচ, বীমা ব্যয় এবং শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতাও জ্বালানি তেলের মোট আমদানিমূল্য বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ববাজারে তেলের দরপতন হলেও এই আনুষঙ্গিক খরচগুলো কমেনি, বরং মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন ও পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। এই বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করতে না পারলে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর লোকসানের বোঝা পাহাড়সম হয়ে দাঁড়াবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেল বিক্রিতে ভর্তুকি প্রদান দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। যখন ভর্তুকির পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তখন উন্নয়নমূলক কাজের বরাদ্দ থেকে অর্থ স্থানান্তর করতে হয়। এতে দেশের বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের গতি মন্থর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ঝুঁকি এড়াতে সরকার প্রায়শই আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানির দাম পুনর্নির্ধারণের পথ বেছে নেয়। অবশ্য এই প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা আছে কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বা অটোমেটেড প্রাইসিং ফর্মুলা থাকা জরুরি, যাতে করে বিশ্ববাজারের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিয়মিত ব্যবধানে দেশেও দামের সমন্বয় হতে পারে।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপ সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে সরকার যে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে, সেটিও বাস্তবতা। জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমদানিনির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে গতি আনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেবল তেলের দাম বাড়ানো বা কমানোর ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কারই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের চাবিকাঠি।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ । ৪:১৪ পূর্বাহ্ণ