আজকের কাজ আগামীকাল: আলস্য বনাম অভ্যাসের মনস্তত্ত্ব

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬ । ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ

অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসূত্রতার গোলকধাঁধায় আটকে থাকা মানুষের জীবন দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। কর্মব্যস্ত জীবনে আমরা যখন কোনো নির্দিষ্ট কাজ সময়মতো সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হই, তখন তার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, পরিবারের সদস্যদের ওপরও পড়ে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহমেদ ইশতিয়াকের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করার পর থেকেই শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। সেখানে ফুটে উঠেছে ঘরের ভেতরে মা ও ছেলের সম্পর্কের টানাপোড়েন আর একটি ইলেকট্রিক চুলা কেনা নিয়ে দীর্ঘদিনের গড়িমসির গল্প।

গল্পের প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গভীর অর্থবহ। ইশতিয়াক নামে একজন যুবককে কেন্দ্র করে এই ঘটনাটি আবর্তিত হয়। তার মা অভিযোগ করেন যে, তার ছেলে কোনো কাজই সময়মতো সম্পন্ন করে না। রান্নাঘরের গ্যাসের সংকটের কারণে তিনি একটি ইলেকট্রিক চুলা কিনতে বলেছিলেন, কিন্তু ইশতিয়াক সেটি বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে। মায়ের ভাষায়, তার ছেলের মধ্যে এক অদ্ভুত রোগ আছে, যেটিকে তিনি বলছেন কাল করব রোগ। অর্থাৎ যে কোনো কাজের ক্ষেত্রেই বর্তমানের বদলে ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করার প্রবণতা। এটি যেন আমাদের অনেকেরই দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি, যেখানে আমরা জরুরি কাজগুলো আগামীর দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাই।

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ধরনের দীর্ঘসূত্রতা বা প্রোক্রাস্টিনেশন অনেক সময় মানসিক অস্থিরতা থেকে তৈরি হয়। ইশতিয়াকের মায়ের অভিযোগ অনুযায়ী, সময়মতো খাওয়া-দাওয়া না হওয়ায় তার স্বাস্থ্যগত সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। প্রেশারের সমস্যায় ভোগা একজন বয়স্ক মানুষ যখন তার সন্তানের ওপর নির্ভর করেন এবং সেই সন্তান যদি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন পারিবারিক শান্তি বিঘ্নিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। ডাক্তার যখন রোগীর চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে যান, তখন তিনি কেবল শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণগুলোই দেখেন না, বরং এই সামাজিক ও মানসিক প্রেক্ষাপটটিও লক্ষ্য করেন।

এই ঘটনার আড়ালে একটি বড় বিষয় হলো সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা। মা-বাবারা যখন দেখেন তাদের সন্তানেরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে না, তখন তারা এক ধরনের অসহায়ত্ববোধ করেন। ইশতিয়াক তার বয়ানে স্বীকার করেছেন যে, অবিবাহিত বড় সন্তানদের নিয়ে মা-বাবার প্রত্যাশা ও হতাশার বিষয়টি প্রায়শই এমন ছোটখাটো ঘটনা থেকে প্রকাশ পায়। আধুনিক জীবনের যন্ত্রনা ও দায়িত্ববোধের এই লড়াই শুধু একটি ইলেকট্রিক চুলা কেনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ব্যর্থতাকেও নির্দেশ করে।

অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞমহল থেকে উচ্চমানের মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বারবার উঠে আসছে। প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত, যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। যখন কেউ নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেই গুছিয়ে রাখতে পারে না, তখন বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। সুতরাং, কাল করব রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের বর্তমানকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করা এবং দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হওয়া আমাদের জীবনের সামগ্রিক গুণগত মান উন্নত করতে পারে। এই ছোট্ট ঘটনার শিক্ষা হলো, ভবিষ্যতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা জীবনের ছন্দ নষ্ট করে দেয়, তাই আজকেই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন