কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সাধারণত জনকল্যাণ ও এলাকার মানুষের স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসার কথা। কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর সেটি একই দিনে দুবার উদ্বোধন করার মতো এক বিচিত্র ঘটনার সাক্ষী হয়েছে এলাকাবাসী। সকালে এক রাজনৈতিক নেতা উদ্বোধন করেছেন, আর বিকেলের আলো নিভতে না নিভতেই একই সড়ক নতুন করে ফিতা কেটে উদ্বোধন করেছেন অন্য দলের আরেক নেতা। উন্নয়ন কাজের চেয়ে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এই প্রদর্শনী দেখে হতবাক সাধারণ মানুষ।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, সকালে সড়কটির উদ্বোধন করেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি মূলত স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করার বার্তা দিয়েই তার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছিলেন। কিন্তু তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরেই বিকেলের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই একই রাস্তায় হাজির হন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কোনো ধরনের প্রশাসনিক সমন্বয় ছাড়াই তার উপস্থিতিতে ফের ওই সড়কের উদ্বোধন করা হয়। এভাবে দুই নেতার পাল্টাপাল্টি উদ্বোধনের ফলে সাধারণ মানুষ রীতিমতো বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, এটি প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার চূড়ান্ত পর্যায়, নাকি রাজনৈতিক ইগো—কিসের কারণে এমনটা ঘটলো?
সাধারণত যেকোনো সরকারি প্রকল্পের কাজ শেষ হলে নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তা উদ্বোধন করেন। সেখানে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক পরিচয়কে বড় করে দেখানোই যেন এখনকার স্থানীয় রাজনীতির সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রেষারেষি ও দ্বন্দ্ব রয়েছে। সেই দ্বন্দ্বের প্রতিফলনই দেখা গেছে এই সড়ক উদ্বোধনের ঘটনায়। উন্নয়ন কাজকে সাধারণ মানুষের সেবার চেয়ে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এর ফলে উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে অসুস্থ প্রতিযোগিতার বিষয়টি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহলেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বা প্রকৌশল বিভাগের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা সমন্বয় থাকলে হয়তো এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো। প্রকল্পের মালিকানা বা কৃতিত্ব নেওয়ার এই লড়াই জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে রাজনৈতিক রেষারেষিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। এই ঘটনায় উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক স্টান্টবাজিই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। স্থানীয়রা মনে করছেন, জনপ্রতিনিধিদের উচিত উন্নয়নমূলক কাজে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এবং জনসেবাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা।
মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে এই ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে উন্নয়নের গতিপথ বাধাগ্রস্ত হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট মহলের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এ ধরনের হীনমন্যতার পরিচয় দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টি নিয়ে এখন সব মহলে তোলপাড় চলছে এবং এটি সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হচ্ছে। জনগণের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা রাজনৈতিক রেষারেষি থাকুক, কিন্তু জনস্বার্থের বিষয়গুলোকে সব সময় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা উচিত। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এখন থেকে এ ধরনের প্রকল্প উদ্বোধনের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬ । ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ