মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য ও চীনের চ্যালেঞ্জ: একটি বৈশ্বিক পরিবর্তনের সমীকরণ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬ । ৮:১৪ পূর্বাহ্ণ

আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য বা হেজেমনি এখন নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গত কয়েক দশকে বিশ্ব বাণিজ্য ও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের যে নিরঙ্কুশ প্রভাব ছিল, তা ক্রমশ সংকুচিত হতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে চীনসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, যারা ডলারের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে চাইছে। ঐতিহাসিকভাবে ডলারের এই শক্তিশালী অবস্থান কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতারও পরিচায়ক হিসেবে কাজ করেছে, যা এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে।

সত্তরের দশকে তৎকালীন মার্কিন অর্থমন্ত্রী জন কনেলি যখন বলেছিলেন যে ডলার মার্কিন মুদ্রা হলেও সমস্যাটি অন্যদের, তখন থেকেই মূলত বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে ডলারের একচ্ছত্র দাপটের চিত্র স্পষ্ট হতে থাকে। সেই সময় থেকে ডলারের মুদ্রানীতি সারা বিশ্বের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে আসছে। তবে বর্তমান সময়ে পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্ব অর্থনীতি এখন বহুমুখী হয়ে উঠছে এবং একক কোনো দেশের মুদ্রা বা নীতি যে দীর্ঘমেয়াদে পুরো বিশ্বের ভার বহন করতে পারে না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিতর্ক বাড়ছে। বিশেষ করে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিষেধাজ্ঞার মতো অস্ত্র ব্যবহারের ফলে অনেক দেশই ডলারের ওপর তাদের নির্ভরতা হ্রাস করতে বাধ্য হচ্ছে।

চীন এই প্রক্রিয়ার অগ্রভাগে রয়েছে। বেইজিং তাদের নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে নানা কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জ্বালানি তেলসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের কেনাবেচায় ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে ডলারের পরিবর্তে সরাসরি স্থানীয় মুদ্রার লেনদেনে উৎসাহিত করা। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের ডলার সংকটের বিষয়টি চীনকে তাদের মুদ্রানীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন প্রেরণা জুগিয়েছে। ব্রিকস জোটের দেশগুলোও এখন অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা কিংবা ডলারমুক্ত বাণিজ্যের পথ খোঁজার চেষ্টা করছে, যা কার্যত বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের প্রভাব কমানোরই একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

তবে ডলারের আধিপত্য ভেঙে ফেলা রাতারাতি সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাপী ব্যাংক লেনদেনের অবকাঠামো এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা বিবেচনায় ডলার এখনও অপরাজেয়। কিন্তু মুদ্রার ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আনা এবং বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলার যে জোরালো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতি একক মুদ্রাকেন্দ্রিক থাকবে না। চীন তার নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা প্রকল্প এবং আন্তঃদেশীয় পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে বিকল্প এক আর্থিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু যে মার্কিন প্রভাব কমবে তা নয়, বরং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তন কেবল মুদ্রার বিনিময় হারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ার ইঙ্গিত দেয়। ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার এই লড়াই বিশ্ব রাজনীতিতেও নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে এশীয় অঞ্চলের দেশগুলো এখন তাদের কৌশলগত প্রয়োজনে ডলারের বাইরে নতুন অংশীদারিত্বের দিকে ঝুঁকছে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি বিশ্ব অর্থনীতির আগামী দিনের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

  • সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল মিয়া

প্রিন্ট করুন