সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতায় সুনামগঞ্জ বন্ধুসভার উদ্যোগে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত কাব্যোপন্যাস ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ নিয়ে একটি প্রাণবন্ত পাঠচক্রের আয়োজন করা হয়েছে। আধুনিক ও মানবিক সাহিত্যের চর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই মূলত এই আয়োজনটি সম্পন্ন হয়। সাহিত্যপ্রেমী তরুণদের অংশগ্রহণে মুখর ছিল এই পাঠচক্র। সভায় আলোচকরা কাব্যোপন্যাসটির বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং বইটির শিল্পগুণ ও সামাজিক বার্তাগুলো নিয়ে তাদের ভাবনা তুলে ধরেন।
কাব্যোপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সোজন ও দুলীকে নিয়ে আলোচনার সময় উঠে আসে এক হৃদয়স্পর্শী আখ্যান। ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের দু’জন মানুষ কীভাবে একে অপরের প্রেমে পড়েন এবং সমাজ ও ধর্মের কঠোর বেড়াজালে আটকা পড়ে তাদের জীবন কোন পথে বাঁক নেয়, তা নিয়েই মূলত আবর্তিত হয়েছে পুরো পাঠচক্রের মূল আলোচনা। আলোচকরা বলেন, জসীমউদ্দীন তার লেখনীর মাধ্যমে কেবল দু’টি মানুষের ভালোবাসার গল্পই বলেননি, বরং সমকালীন সমাজের চিত্রকেও ফুটিয়ে তুলেছেন। তাদের মতে, ব্যক্তিগত আবেগের চেয়েও সমাজ ও ধর্মের প্রভাব যখন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানবিক সম্পর্কগুলো কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা এই বইটিতে অসাধারণ নিপুণতায় চিত্রিত হয়েছে।
পাঠচক্রের আলোচনায় সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, আজকের দিনেও এই কাব্যোপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি। বরং সমাজের বিদ্যমান বিভেদ ও সংকীর্ণতার মাঝে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে বার্তা জসীমউদ্দীন দিয়ে গেছেন, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত জরুরি। পাঠকরা মনে করেন, সোজন ও দুলীর ভালোবাসা কেবল একটি রোমান্টিক গল্প নয়, এটি যেন তৎকালীন সমাজের প্রতি এক বিশাল অভিযোগ এবং মানবিক প্রেমের জয়গান।
বন্ধুসভার সদস্যরা এই ধরণের পাঠচক্রের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, সৃজনশীল ও মননশীল চর্চায় নিজেকে সমৃদ্ধ করতে সাহিত্য পাঠের কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত পাঠচক্র আয়োজনের মাধ্যমে তারা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় নিজেদের জ্ঞান বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছেন। জসীমউদ্দীনের মতো কালজয়ী লেখকের সৃষ্টিগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই তারা নিয়মিত এমন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
উপস্থিত সদস্যরা আরও বলেন, বর্তমান সময়ের যান্ত্রিকতায় যখন মানুষ বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন পাঠচক্রের মাধ্যমে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করলে সাহিত্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে। সোজন বাদিয়ার ঘাট-এর মতো ক্লাসিক সাহিত্যগুলো পড়ার মাধ্যমে তরুণরা সমাজের গভীরতর সংকটগুলো বুঝতে শিখবে এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়তে উদ্বুদ্ধ হবে। সুনামগঞ্জ বন্ধুসভার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী দিনগুলোতেও তারা দেশীয় সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ নিয়ে এ ধরণের আয়োজনের ধারা অব্যাহত রাখবে। সবশেষে অংশগ্রহণকারীদের অংশগ্রহণে বইটি নিয়ে একটি উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬ । ১০:১৫ অপরাহ্ণ